ইসলাম ও সমাজ
পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। ‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ১০। এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য নানা ঐতিহাসিক ঘটনা, শিক্ষা ও ইবাদতের কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ ছাড়া আশুরার দিন ইসলামের ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মৃতি বহন করে। ৬১ হিজরির এই দিনে ফোরাত নদী-তীরবর্তী কারবালার ময়দানে শহীদ হন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। তিনি হজরত আলী (রা.) ও হজরত ফাতেমার (রা.) পুত্র।
হজরত আলীর (রা.) মৃত্যুর পর খলিফা হন হজরত মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি জীবদ্দশাতেই পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। তবে ইয়াজিদের কাছে বায়াত নিতে অস্বীকৃতি জানান ইমাম হোসাইন (রা.)। প্রতিবাদে মদিনা ছেড়ে কুফায় হিজরতের জন্য যাত্রা করেন তিনি। পরে কারবালা ময়দানে সঙ্গীদের নিয়ে যাত্রাবিরতি করেন।
ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের আটক করে মদিনায় ফিরিয়ে নিতে ইয়াজিদের নির্দেশে উমর ইবনে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে।
আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ইমাম হোসাইনের শিবিরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা। পানির অভাবে কাফেলার নারী-শিশুরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লেও ইমাম হোসাইন (রা.) আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান।
১০ মহররম অবরোধের বিরুদ্ধে অসম এক যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর ৭২ সঙ্গী শহীদ হন। সিমার ইবনে জিলজুশান কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে ইমাম হোসাইনকে (রা.) হত্যা করে।
ইসলাম ধর্মমতে, ১০ মহররম আশুরার দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
আশুরার দিনে আল্লাহতায়ালা অসংখ্য নবী-রাসুলকে বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কী?’ তারা বলল, ‘এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউন থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউনকে দলবলে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছেন।’
আরও বর্ণিত আছে, এই দিনে আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল করেছেন। হজরত নূহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে নোঙর করেছে। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হজরত আইয়ুব (আ.) রোগমুক্তি লাভ করেছেন। ইমাম বায়হাকি ও ইবনে কাসির এসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে রোজা রাখা।
তবে ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়াতে তিনি আশুরার সঙ্গে ৯ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করো। এর এক দিন আগে বা এক দিন পরে রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমাদ)
তাই ৯-১০ বা ১০-১১ মহররম রোজা রাখা সুন্নাত।
আশুরার দিনে হজরত আদম (আ.) মহান আল্লাহর নিকট থেকে ক্ষমা পেয়েছেন। তাই এই দিনে বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়া, পরিবারের জন্য খরচ করা উচিত।
হাদিসে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচে প্রশস্ততা অবলম্বন করবে, আল্লাহ সারাবছর তার রিজিকে প্রশস্ততা দান করবেন।’ (বায়হাকি, শুআবুল ইমান) তবে এর নামে অতিরিক্ত খানাপিনা বা কুসংস্কার বর্জনীয়। সাদাকা করা, গরিব-দুঃখীকে দান করা, ইলম চর্চা করা বা এই দিনের সঠিক ইতিহাস জানা ও জানানো।
পবিত্র আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আশুরার রোজা পালন, আল্লাহকে স্মরণ, তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে কারবালার শিক্ষা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
