পরিবেশ
জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন শৈশব, বিপন্ন ভবিষ্যৎ
শাহেদ কায়েস
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১১:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হলে আমরা প্রায়ই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক উপাত্ত কিংবা ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত পৃথিবীর কথা বলি। যেন বিষয়টি এখনও অনেক দূরের; আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরে থাকা কোনো বিপদের গল্প। বাস্তবতা আসলে অনেক বেশি কাছের এবং অনেক বেদনাদায়ক। কারণ এই সংকটের সবচেয়ে গভীর আঁচ গিয়ে লাগছে সেই শিশুদের গায়ে, যারা এখনও পৃথিবীকে চেনে বৃষ্টিতে ভেজা মাঠ, নদীর পাড়, স্কুলের উঠান আর মায়ের হাতের উষ্ণতার মধ্য দিয়ে। কোনো উপকূলীয় গ্রামের ছোট্ট শিশুটি হয়তো বারবার ঘূর্ণিঝড়ের পর ভাঙা ঘর দেখে বড় হচ্ছে; কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা কোনো শহুরে বস্তির শিশু প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আবার কোথাও বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে বই-খাতা আর শৈশবের অসংখ্য রঙিন স্বপ্ন। জলবায়ু সংকট তাই আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় নয়। এটি আজ লক্ষ কোটি শিশুর প্রতিদিনের জীবন, তাদের ভয়, অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির গল্প।
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক ‘চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’ পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে, প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে যেন লুকিয়ে আছে কোনো এক শিশুর মুখ, কোনো মায়ের উৎকণ্ঠা, কোনো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। বৈশ্বিক এই সংকটের মানচিত্রে যখন আমরা চোখ রাখি, তখন সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ নামগুলোর একটি হিসেবে সামনে আসে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ইউনিসেফের ডেটাবেজ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিশু, সংখ্যায় যা প্রায় ১১০ কোটি, একই সঙ্গে অন্তত তিনটি ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আর ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের শিশুরা এই বহুমাত্রিক সংকটের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
আমাদের দেশের শিশুরা কোনো তাত্ত্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। তারা এর মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। কিংবা বলা ভালো, টিকে থাকার লড়াই করছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু এমন সব এলাকায় বাস করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরমভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রের নোনাপানি ভেতরে ঢুকে পড়ার কারণে তাদের জীবন আজ ভয়াবহভাবে বিপদাপন্ন। সাতক্ষীরা, খুলনা বা বাগেরহাটের লবণাক্ত পানিপ্রবণ এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এই নোনাপানির কারণে শিশুরা চর্মরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার দেশের উত্তরাঞ্চল ও নদী অববাহিকার কুড়িগ্রাম বা জামালপুর জেলার শিশুরা প্রতিবছর নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যার শিকার হচ্ছে। যখন একটি চরের জমি বা ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়, তখন একটি শিশুর পুরো চেনা পৃথিবী এক নিমেষে হারিয়ে যায়। এর বাইরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর আরেকটি নীরব ঘাতক চেপে বসেছে। তা হলো তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ। দেশের বড় শহরগুলো থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, সবখানে গরমের তীব্রতায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো এককরৈখিক বিপর্যয় নয়। এর প্রভাব একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে। তীব্র খরা বা বন্যা শুধু ফসলের মাঠকেই পুড়িয়ে বা ভাসিয়ে মারে না। তা ডেকে আনে চরম খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি। ঘর হারানোর এই যন্ত্রণার পর গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা যখন পরিবারের সঙ্গে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকা বা অন্য কোনো বড় শহরের বস্তিতে এসে আশ্রয় নেয়, তখন তাদের স্বাভাবিক শৈশব চিরতরে থমকে দাঁড়ায়। সেখানে তারা শিকার হয় চরম নিরাপত্তাহীনতার। বঞ্চিত হয় বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন থেকে। এর ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগগুলো শিশুদের খুব সহজেই গ্রাস করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে শিশুদের মৌলিক অধিকারের ওপর। ইউনিসেফ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট দেখিয়েছে, জলবায়ুজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। পরিবারগুলো যখন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তখন বাধ্য হয়ে কন্যাসন্তানদের বাল্যবিয়ে দেওয়া হয় এবং ছেলেদের ঠেলে দেওয়া হয় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে। জলবায়ু সংকট এভাবে আমাদের একটি পুরো প্রজন্মের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে।
জলবায়ু সংকট বৈশ্বিক হলেও এর আঘাত কিন্তু সবার ওপর সমানভাবে আসে না। ইউনিসেফের প্রতিবেদনটি খুব নিখুঁতভাবে দেখিয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক সেবার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এই ঝুঁকির তীব্রতা কম-বেশি হয়। ভিয়েতনামের ভিন সিটিতে বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবুঝ শিশু, সুদানের তপ্ত বালুঝড়ের মধ্যে আশ্রয়শিবিরে কাটানো সেই ছেলে কিংবা আমাদের বাংলাদেশের যমুনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরহারা সেই শিশু– এরা কেউ পরিসংখ্যানের কোনো সংখ্যা মাত্র নয়। প্রত্যেকে বিপন্ন শৈশবের জীবন্ত প্রতীক। অথচ উন্নত বিশ্বের বিলাসী জীবনযাপন ও কার্বন নিঃসরণের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের এই প্রান্তিক শিশুদের। এই চরম আন্তর্জাতিক অসমতা ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়।
এই বিপর্যয় থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক ফোরামে উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে জরুরি ও সমন্বিত শিশুবান্ধব পদক্ষেপ। ইউনিসেফের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার আলোকে আমাদের বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে প্রথমত বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ও জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) বরাদ্দগুলোতে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে সরাসরি অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে এমনভাবে দুর্যোগ-সহনশীল সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে তৈরি করতে হবে যেন তা তীব্র বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা চরম তাপদাহেও সচল থাকে এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারে। তৃতীয়ত, জলবায়ু শিক্ষা ও শিশুদের কণ্ঠস্বরকে প্রাধান্য দিতে আমাদের শিক্ষাক্রমে জলবায়ু সচেতনতা ও দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি জলবায়ু নীতি নির্ধারণে তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব শেষে, গ্লোবাল শিল্ড বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড থেকে বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক তহবিলপ্রাপ্তি নিশ্চিতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।
আজকের শিশুরা রাজনৈতিক এজেন্ডা বোঝে না। তারা বোঝে না কার্বন ক্রেডিটের জটিল হিসাবনিকাশ। তারা শুধু বাঁচতে চায় একটি নিরাপদ, সবুজ ও সুস্থ পৃথিবীতে। আজ যদি আমরা উদাসীনতার কারণে বাংলাদেশের এই কোটি কোটি শিশুকে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।
ইউনিসেফের ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদন আসলে কোনো দূরবর্তী সংকটের পূর্বাভাস নয়, এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়া চূড়ান্ত সতর্কঘণ্টা। সিদ্ধান্ত এখন বিশ্বনেতাদের ও আমাদের নীতিনির্ধারকদের– আমরা কি শিশুদের একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ দেব, নাকি জলবায়ুর এই নরককুণ্ডে তাদের শৈশবকে চিরতরে বিসর্জন দেব?
শাহেদ কায়েস: কবি ও অধিকারকর্মী
- বিষয় :
- পরিবেশ
