ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নবদিগন্তের সূচনা

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নবদিগন্তের সূচনা
×

মো. আমানউল্লাহ আমান

মো. আমানউল্লাহ আমান 

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ২২:৫৪ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ২৩:৪০

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত ১৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের অঙ্গীকার এটিই প্রমাণ করে যে- বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। এই সফরের মূল অর্জনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়- বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার এবং চীন হয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির বিষয়ে প্রস্তাব এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে।
  
এছাড়া বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিকাঠামো বিনির্মাণে ‘গ্রিন ডেভেলপমেন্ট প্রমোট করতে ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন’ এবং দেশের শিল্প খাতকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে ‘এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়াতে ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন’ সংক্রান্ত চুক্তিগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে এক নতুন গতি দেবে, যা চীনের বিশাল বাজারে আমাদের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে- দেশের কৃষি-অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করে জাতীয় ফল কাঁঠাল সরাসরি চীনে রপ্তানির জন্য যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা আমাদের অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে ‘ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট’ এবং ‘হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান’ এর পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহযোগিতায় দুটি পৃথক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি উৎপাদনশীল শ্রমবাজারের সাথে সংযুক্ত করবে। অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছে কনসেশনাল লোন বা রেয়াতি ঋণের সুদের হার কমানো এবং গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট আলোচনার মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ঋণের বোঝা লাঘব করতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। 

এর পাশাপাশি তথ্য, গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক ফোরাম এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পারস্পরিক কোলাবোরেশন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৪টি ভিন্ন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কুল কারিকুলামে চীনা ভাষা ‘মান্দারিন’ অন্তর্ভুক্ত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগকে গভীরতর করবে। 

বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ ১২৫ জনেরও বেশি শীর্ষ চীনা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির সামনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণা- ‘বিনিয়োগ করুন, সব সুবিধা পাবেন’ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, যেখানে তিনি বিদেশি পুঁজির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন আইনি সুরক্ষা এবং মূলধন ও লভ্যাংশ সরাসরি নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার দ্ব্যর্থহীন নিশ্চয়তা দিয়েছেন। 

এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করতে একটি কঠোর ‘১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করেছে এবং দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে যাতে নতুন বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারে, সেজন্য লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সহজতর করা হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় একটি ডেডিকেটেড অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উন্নত লজিস্টিকস, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি ও সমুদ্রবন্দর সংযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে, যার পরিপূরক হিসেবে বিডায় একটি ওয়ান-স্টপ ‘চীন বিনিয়োগ কার্যালয়’ এবং ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘চায়না ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালু করা হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরের অন্যতম সবচেয়ে বড় এবং স্পর্শকাতর সাফল্য হলো বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা তিস্তা নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় চীনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার আশ্বাস লাভ, যা বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও উত্তরাঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতি রক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। 

এছাড়া চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সাথে দেশের ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি বিশেষ আন্তঃদলীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দলগত ও রাষ্ট্রীয় উভয় পর্যায়ে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, ‘চীন একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি এবং তারা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না, তাই তাদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য সম্পূর্ণ যৌক্তিক।’ 

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, ‘বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল চরমভাবে একমুখী ও এককেন্দ্রিক, যার কারণে দেশ দরকষাকষির সক্ষমতা হারিয়ে অনেক অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল; ফলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর সেই স্থবিরতা ভেঙে দেশের স্বার্থে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’ 

বিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের মতে, ‘বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিলে উন্নত প্রযুক্তি এবং সাশ্রয়ী কাঁচামালের জন্য চীনের কোনো বিকল্প নেই।’ 

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, ‘চীনের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বিশাল, এখন মূল প্রশ্ন হলো আমরা আমাদের দূরদর্শিতা দিয়ে সেই সুযোগ কতটা নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগাতে পারি।’ 

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. মো. রুহুল আমিন সরকার বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’, ‘স্ট্রাটেজিক অটোনমি’ এবং ‘হেজিং স্ট্র্যাটেজি’র এক অনন্য ও আধুনিক ধারাবাহিকতা, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির ওপর এককভাবে নির্ভরশীল না থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যমূলক অবস্থানকে অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।’

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিপক্ব ও স্মার্ট খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মো. আমানউল্লাহ আমান, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

আরও পড়ুন

×