ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

জীববৈচিত্র্য ও জেনজি প্রজন্ম

জীববৈচিত্র্য ও জেনজি প্রজন্ম
×

মো. জাকির হোসেন

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের চারপাশের উদ্ভিদ, প্রাণী আর খালি চোখে দেখা যায় না এমন আণুবীক্ষণিক জীবের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েই গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, পৃথিবীতে প্রায় ২.২ কোটি প্রজাতির জীব রয়েছে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ লাখ ৫ হাজার প্রজাতিকে চিনতে পেরেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বিশাল জীবজগৎ প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এল নিনো বা সুপার নিনোর মতো আবহাওয়ার চরম রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পরিবেশকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলেছে।

১৯৮৬ সালে বিজ্ঞানী ডব্লিউ.জি. রোজেন প্রথম ‘বায়োডাইভার্সিটি’ বা ‘জীববৈচিত্র্য’ শব্দটি ব্যবহার করেন। সহজ কথায়, কোনো একটি অঞ্চলের সমস্ত জিন, প্রজাতি এবং পরিবেশের সামগ্রিক রূপই হলো জীববৈচিত্র্য। এই জীববৈচিত্র্য আর পৃথিবীর টিকে থাকা– দুটি বিষয় আসলে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

একটি অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রকৃতির গল্প অন্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। প্রকৃতির নিয়মেই জিনের পরিবর্তনের মাধ্যমে (বিজ্ঞানের ভাষায় মিউটেশন বা পরিব্যক্তি) হাজারো বৈচিত্র্য তৈরি হয়। যেমন একই গাছে ভিন্ন রঙের ফুল ফোটা, নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব– এসবই জিনগত পরিবর্তনের ফল। এই ক্রমাগত বদলে যাওয়া প্রকৃতি ও জীবজগৎ যখন নতুন রূপ নেয়, তাকেই আমরা কল্পনা করতে পারি ‘জেনজি বাস্তুতন্ত্র’ হিসেবে।

একটি সমাজ যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষকের মতো ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষের দক্ষতায় টিকে থাকে; প্রকৃতিও তেমনি টেকসই হয় নানা রকমের জীববৈচিত্র্যের কারণে। মানুষ চিরকালই প্রকৃতির এই রহস্যকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য, ওষুধ, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করে আসছে। কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের এই রূপান্তর ও গতিশীলতা আজও এক মস্ত বড় রহস্য। এই রহস্যগুলোকে উন্মোচন করা এবং পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী রাখাটাই বর্তমান ‘জেনজি’ বা নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর অস্তিত্ব সংকটে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) রেড ডেটা বুক অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার ৫০০ প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে বা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বাঁধ নির্মাণ, বন উজাড়, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে প্রতিদিন জীবের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে পরিষ্কার বলা আছে– রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করবে। এ ছাড়া দেশে ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন’ এবং নানা কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু শুধু কাগজ-কলমে আইন থাকলেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। আইন ও বিধিবিধানের অভাব না থাকলেও মানুষের চিন্তাভাবনা ও আচরণের পরিবর্তনের জন্য কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না। ভবিষ্যতে সুপেয় পানির সংকট, দাবানল, নতুন নতুন মহামারি এবং পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে জেনজি প্রজন্মকে এখনই দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের মূল কাজগুলো হবে– 

গবেষণা করা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের কী ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা করা। বিকল্প তৈরি করা: ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে জৈব ও নিরাপদ উপায় অনুসন্ধান এবং পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা। বাসস্থান রক্ষা: বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় উদ্ভিদের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস না করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। সাংস্কৃতিক বিপ্লব: পরিবেশ রক্ষাকে শুধু আইনের বিষয় না বানিয়ে এটিকে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার জন্য একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন বা বিপ্লব গড়ে তোলা।
প্রকৃতির গতিশীলতার রহস্যকে জয় করে একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের হাতে। জীববৈচিত্র্য বাঁচলে তবেই মানুষের সভ্যতা টিকে থাকবে।

ড. মো. জাকির হোসেন: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিকল্পনা শাখা, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন

×