ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

প্রতিশ্রুতি অপেক্ষা বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিশ্রুতি অপেক্ষা বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চার দিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফরস্বরূপ গত ২২ জুন তিনি তথায় যান। সেইখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সহিত আনুষ্ঠানিক বৈঠক করিয়াছেন। চীনের পূর্বে তিনি মালয়েশিয়া গিয়াছিলেন ২১ জুন। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর লইয়া আমরা ইতোপূর্বে এই স্তম্ভে মন্তব্য করিয়াছি। বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার এবং ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হিসাবে তাঁহার চীন সফর নিশ্চয় অধিকতর মনোযোগ দাবি করে। কূটনৈতিক মহল তো বটেই, জনসাধারণের মধ্যেও ইহা লইয়া কৌতূহল রহিয়াছে।

সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হইতে আমরা অবগত, বেইজিং সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নূতন ধাপে উন্নীত করিবার ঘোষণা আসিয়াছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হইয়াছে, যেইগুলিতে যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগ, বিনিয়োগ, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিসহ বহু বিষয় স্থান পাইয়াছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ হইতে ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার প্রচার করা হইয়াছে। তৎসহিত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারেক রহমান ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর বিবৃতি প্রচার করিয়াছে। এই সকল বিষয় প্রমাণ করে, প্রধানমন্ত্রীর সফরটি চীন সরকারের নিকট কতখানি গুরুত্ব পাইয়াছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর সহিত আলোচনায় চীনের শীর্ষ নেতার এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ– বিশ্বে যেই কোনো পরিবর্তনই আসুক, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু,’ ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসাবেই রহিবে। অবশ্য বাংলাদেশের সহিত চীনের গভীর সম্পর্ক নূতন নহে।

আলোচ্য সফরটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হইল যখন বাংলাদেশ প্রধানত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বহুবিধ সংকট মোকবিলা করিতেছে। আসন্ন অর্থবৎসরের জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান লইয়া যদ্রূপ উদ্বেগ রহিয়াছে, তদ্রূপ বৈদেশিক মুদ্রার চাপের সহিত রহিয়াছে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ। বন্দর আধুনিকায়নের জরুরি তাগিদের সহিত জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনও কম নহে। আমরা জানি, এই সকল ক্ষেত্রে চীনের সামর্থ্য বিপুল। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রকে সহায়তা করিবার ক্ষেত্রে দেশটির আগ্রহও ইতোপূর্বে বারংবার প্রমাণিত। তাই উক্ত সফরে জনগণের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গড়িবার স্বার্থে অংশীদারিত্বের পাশাপাশি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের সহিত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের আগ্রহ আমাদের জন্য আশীর্বাদ হইতে পারে। চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প আগাইয়া লইবার বিষয়ে উভয় দেশের সম্মতিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। 

প্রশ্ন হইতেছে, এই সফরকালে গৃহীত দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্তসমূহ এবং চীনের ন্যায় রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়ন বা কার্যে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা সক্ষমতা কতখানি রহিয়াছে? স্মরণ করা যাইতে পারে, চীনের পক্ষ হইতে বাংলাদেশকে ১০০ শতাংশ শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হইয়াছিল প্রায় দুই বৎসর পূর্বে। কিন্তু অদ্যাবধি উহা কিতাবেই সীমাবদ্ধ রহিয়া যাইবার কারণে দুই দেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসেরও লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। চীনের সহায়তায় বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়নও বহু বৎসর যাবৎ একই স্থানে ঘুরপাক খাইতেছে মূলত বাংলাদেশের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। 
চীনের সহিত ইতোপূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি উত্তম কিংবা অধম– আমরা সেই বিতর্কে যাইতেছি না। আমরা বলিতেছি সিদ্ধান্তহীনতার ঝুঁকি সম্পর্কে। আমরা মনে করি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এইরূপ সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিশ্রুতিই গৃহীত কিংবা বিনিময় হওয়া উচিত, যেইগুলি বাস্তবায়নযোগ্য। কেবল চীন নহে; অন্য কোনো দেশ কিংবা উন্নয়ন অংশীদারের নিকট হইতে প্রাপ্ত প্রতিশ্রুতি বা সহায়তার পূর্ণ সুফল নিশ্চিতকরণের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করিবার বিকল্প নাই।

আরও পড়ুন

×