আন্তর্জাতিক
গাজা নিয়ে বিশ্ব সোচ্চার, ভারত নীরব
সোনিয়া গান্ধী
সোনিয়া গান্ধী
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন নিশ্চিত হয়েছিল– ইসরায়েলি সরকার গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে সেই একই কমিশন পুনরায় অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য হলো শিশুদের নিশানা করে গাজায় ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া। বর্তমানে এই কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতের একজন বিশিষ্ট আইনবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এস মুরালিধর।
আড়াই বছর আগে ইসরায়েলের ওপর হামাস নৃশংস, ভয়াবহ এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এক হামলা চালিয়েছিল। তবে এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এরই মধ্যে এটি স্পষ্ট হয়েছে, ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতারা যে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল, তা চরম নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতায় রূপ নিয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ করা এবং ‘টোটাল অ্যানিহিলেশন’ বা সম্পূর্ণ ধ্বংসের ডাক দিয়েছেন; ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ বলে চিহ্নিত করেছেন, যাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’ বলে তারা ঘোষণা দিয়েছেন। আর ইসরায়েলের সাফল্য বলতে বুঝিয়েছেন ‘লাখ লাখ মানুষের গাজা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া’।
এই প্রকাশ্য গণহত্যামূলক মনোভাব সত্ত্বেও ট্রাম্প সরকার ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এই নির্মম অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশ তাদের বিবেকের তাড়না অনুভব করতে পেরেছে।
আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এরপরও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দারুণ কিছু ভূমিকা রেখেছে। যেমন সংস্থাগুলো ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে দশকের পর দশক উদাসীন থাকার পর অবশেষে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব উদাসীন রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকা; ভারতের মতোই যার ঔপনিবেশিকতাবিরোধী লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস ও সংহতি রয়েছে, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দাঁড় করিয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিশ্বজনমত এবং গাজায় চালানো এই অন্যায় বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সোচ্চার ভূমিকা রাখার পরও ভারত একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে নীরব থেকেছে। বিচারপতি মুরালিধরের এই প্রতিবেদন, যা গাজা গণহত্যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে কেবলই এক পাথুরে নীরবতা। অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার প্রাক্কালে বিজেপি নেতাদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরপরই বিচারপতি মুরালিধরকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছিল।
উত্তর-ঔপনিবেশিক সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি অঙ্গীকারের কারণে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ভারত ঐতিহাসিকভাবে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন ছিল। আর আজ আমরা বিশ্বব্যবস্থার এই চরম লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের সহনাগরিকদের এই অবর্ণনীয় কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের এই প্রকাশ্য লাঞ্ছনার প্রতি আমাদের ধারাবাহিক উদাসীনতার কারণে আমরা নেতিবাচকভাবে ‘অনন্য’ হয়ে উঠছি।
মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেবল নৈতিকভাবেই নিন্দনীয় নয়; জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্পূর্ণ অবোধ্য। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত ফাঁদে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছি, যখন বিশ্ব ক্রমশ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
সোনিয়া গান্ধী: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন; দ্য ইন্ডিয়ান
এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- সোনিয়া গান্ধী
