পাহাড়ে বন্যা কি নিয়মিত হতে থাকবে?
ছবি: সমকাল
উশ্যেপ্রু মারমা
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:১৫ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৩৭
গত কয়েক বছর নিয়মিতভাবে তিন পার্বত্য জেলাবাসীকে বন্যায় তলিয়ে যেতে হচ্ছে। খাগড়াছড়ি আর রাঙামাটিতে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল, বিল, ঝিরি, ঝর্ণা ও নদী হয়ে কাপ্তাই বাঁধে গিয়ে জড়ো হয়। সেই পানি কর্নফুলী নদী দিয়ে প্রবাহিত হতে পারলে চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরে মোহনায় গিয়ে পড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু কাপ্তাই বাঁধের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে পানি ছাড়ে না। এদিকে বাঁধের ওপর দিকে চেঙ্গি, মাইনিং, কাচালাং নদীগুলোতে পলিমাটি জমে গভীরতা কমে গেছে। ব্যাপক বালু উত্তোলনের কারণেও নদীর স্বাভাবিক নাব্য তেমন বাড়ছে না। নদীর দুই তীরে ব্লক বসিয়ে ভাঙন রোধ করা হলেও দু’দিনের টানা বৃষ্টির পানিকে ধারণ করে রাখার মতো ক্ষমতা নদীগুলো হারিয়েছে। এসব কারণে কি বন্যা অবধারিত?
খাগড়াছড়ি পৌরসভা বা জেলা পরিষদের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পানি নিষ্কাশন প্রকল্পগুলোতে এমনভাবে ড্রেনগুলো এস্টিমেট করা হয়েছে, যা মহাপ্রকৌশলীর বদৌলতে পাহাড়ের বৃষ্টির পানি আর নদীতে দ্রুত যেতে পারে না। ২০২৪ সালে পাহাড়ের ঢল এসে এই শহরে কীভাবে বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো সেটি নিজ চোখে দেখলাম। প্রচুর সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ দিয়ে ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। পরের বছর এ ব্যাপারে আর কোনো আলোচনা হয়নি। এক বছর বাদে ২০২৬ সালে জুলাইয়ে এসে দেখা গেল আরও ভয়াবহ রূপে বন্যা চলে আসছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলা মিলে পাহাড় ধসে ৪০ জন লোক নিহত হয়েছেন। এদিকে সাজেক পর্যটন এলাকায় চার শতাধিক পর্যটক আটকে যায়। বান্দরবানে পর্যটন রিসোর্ট ও হোটেলগুলোকে বন্ধ করে রাখতে প্রশাসন নির্দেশ দিয়েছে।

আমরা আগে ভাবতাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, ফেনীসহ পুরো বাংলাদেশ বন্যায় ভেসে গেলেও পাহাড়ে অনেক ভালো আছি। সাঙ্গু, কর্ণফুলী, হালদা, ফেনী নদী দিয়ে পাহাড়ের পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পৌঁছে গেলে আমরা বেঁচে যাব। সমতলবাসীকে এক প্রকার করুণা করতাম তখন। পাহাড়ে যাদের সেটলার বলা হয় তারা সমতল থেকে পাহাড়ে এসে হয়তো ভেবেছিল আর কখনও বন্যার পানিতে ভেসে যেতে হবে না। গত কয়েক বছর ধরে সে বাস্তবতা পাহাড়ে আর নেই। এখানে সুউচ্চ থানচি আর রুমার মতো পাহাড়ি এলাকায়ও বন্যা হচ্ছে। নিচু এলাকা দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গার মতো উপজেলাগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এ বছর দিঘীনালার মেরুং ইউনিয়ন একেবারে পানির নিচে ডুবে গেছে। লক্ষণীয়, পাহাড়ি আর বাঙালির মধ্যে মারামারি ঘটনা হলে দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। বন্যা হলে তখন আর একে অপরকে দোষারোপ করার সুযোগ থাকে না। যে ত্রাণ নিয়ে যায় তাঁকে ভাবতে হয় যে, যেন সব পক্ষের মাঝে বিতরণ হয়। কারণ, প্রকৃতির কাছে এই বিভাজিত লোকগুলোও সমানভাবে অসহায়।
খাগড়াছড়ি শহরে চেঙ্গি নদীটা মায়ের মতো সবাইকে বুকে নিয়ে দীর্ঘকাল প্রবহমান ছিল। গত ১০-১৫ বছর ধরে এ নদী তার জনবসতিদের কাছে নিষ্ঠুরতার করুণ কাহিনি হয়ে উঠেছে। এ শহরে এখন নিয়মিত বন্যা হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা সদর হাটবাজারকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর উন্নয়নের নামে পানিপ্রবাহের জন্য অনেক ছোট ছোট ড্রেন খনন করা হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে বৃষ্টির পানিপ্রবাহের জন্য বাধা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। মানুষের চলাচলের জন্য বড় রাস্তা রাখা হয়েছে। যেহেতু বছরে তিন মাস বৃষ্টি থাকে তাই পানি চলাচলের সরু ড্রেন করলে সমস্যা কী? হয়তো টেন্ডারবাজরা এরকম ভেবেছিল কিন্তু মানুষের অভিশাপ এখন নিয়মিত শুনতে হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি শহরে সেলিম মার্কেটটি গড়ে তোলা হয়েছে পূর্বদিকের খালকে দখল করে। যার ফলে খালটি একদম বাঁকা হয়ে গেছে। ফলে পানি দ্রুত বের হয়ে চেঙ্গি নদীতে পৌঁছাতে দেরি হয়। এদিকে চেঙ্গি নদীর পারে যে ব্লকগুলো বসানো হলো সেটিরও ওপর থেকে আসা পানিকে ধারণ করার সক্ষমতা নেই। কারণ, চেঙ্গী নদীতে দীর্ঘদিন ধরে পলিমাটি জমে গভীরতা কমে গেছে। নিয়মিত বালু উত্তোলনের কারণেও তলের গভীরতা কমে গেলে বর্ষার পানি ওপর থেকে ধেয়ে এলে পার ভেঙে গ্রামের ভেতরে চলে যায়, তখন শহরের আশপাশে গ্রামগুলো পানিতে ভেসে যায়। মানুষের পক্ষে তখন তিন মাস না, তিন মিনিটও পানিতে ভেসে থাকা সম্ভব না।
প্রশ্ন হলো, সরকারি উন্নয়নের ভুল ধারণা, আর বন্যার সঙ্গে লড়াইরত মানুষের ভবিষ্যৎ কী? যেসব জনপ্রতিনিধি ছিলেন তারা কেউ পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। তাহলে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কী? বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পগুলোর কাজে দুর্নীতি যেমন ব্যাপক হয়; তেমনি বড় অপচয়ের কারণে জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর দিকগুলো হিসাব করে দেখা হয় না। এ দেশে তো এমন আইন নেই যে, প্রকল্পের কারণে মানুষের ক্ষতি হলে সেজন্য পূর্ববর্তী ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তি পেতে হয়েছে। এমন নজির কিন্তু নেই। ফলে দুর্বৃত্তরা সরকারকে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত জনদুর্ভোগ প্রকল্প দিয়ে নদীতীরের লোকজনকে ভোগাতে থাকবে।
খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদীতীরের মানুষগুলো স্বাবলম্বী হলেও দান-দক্ষিণা নেওয়ার মতো সমাজের বিভিন্ন নেতা, সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৫-১০ কেজি চাল, ডাল, তেলের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। অথচ পরিকল্পিত পানিব্যবস্থা হলে এ দুর্ভোগ থেকে মানুষ বেঁচে যেত। বৃষ্টির পরিমাণ যত বেশি হোক পাহাড়ের পানি আটকে থাকবে কেন? মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত হলেও এ সমস্যার ব্যাপারে কোনো এনজিও বা রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো উচ্চবাচ্য নেই। ইতোমধ্যে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে বন্যাদুর্গতদের জন্য ১৫০০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনও তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?
আরেকটা বিষয়, যেসব নদী কাপ্তাই বাঁধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেসব নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেছে। নদীতে পলি ভরাট ছাড়াও নিচের দিকে নদীর পারগুলো দখল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে কাপ্তাই বাঁধে পানি উপচে পড়ে নাই। তাহলে ওপরের দিকে নদীর পারের মানুষগুলো পানিতে আটকে যাচ্ছে কেন? কারণ নদীগুলোর মোহনা বা কাপ্তাই বাঁধের সংযোগস্থলে বিভিন্নভাবে দখল-বেদখলের কারণে পানি নিচের দিকে সহজে নামতে পারছে না। অন্যদিকে মূল কাপ্তাই বাঁধে পানি নিষ্কাশন পদ্ধতিতেও অমানবিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। ওপরে গ্রামবাসী পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাঁধের পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। তার মানে যেসব জায়গায় বন্যা হচ্ছে, সেজন্য কাপ্তাই বাঁধের পানি নিষ্কাশনের পদ্ধতি কি দায়ী না? এদিকে প্রকল্পটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল সেটির বাস্তব সুবিধাও পাহাড়বাসী পায়নি। সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে জমা হলে সেটি সারাদেশ ভোগ করে। অথচ পাহাড়ে শতভাগ বিদ্যুৎও হলো না, তেমনি এত বড় বাঁধের অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর পাশের উপজেলাগুলোকে নিয়মিত বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। আগে কাপ্তাই বাঁধের ওপরে বন্যা না হলেও এখন কেন হচ্ছে? বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে? নাকি পানি নিষ্কাশনের সুযোগ না থাকার কারণে।
এদিকে বান্দরবানের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহের সমস্যা নেই। কারণ, সেখানকার পানি আটকাতে দানবীয় কাপ্তাই বাঁধ নেই। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো পাহাড়ের মাটিতে সে সক্ষমতা আগের মতো নেই, যেটি পাহাড়ের বুকে বন্যার ঢেউ দেখে বোঝা যায়। কারণ পাহাড়ের গাছগুলো নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে। কম দামে গাছ কেটে ব্যবসা করে অনেক সমতলবাসী গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছেন। তারা পাহাড়কে গাছশূন্য করে টাকাওয়ালা হলেও পাহাড়কে নিয়ে কোনো ভাবনা থাকার কথা না।

সামাজিক মাধ্যমে থানচি এক পাড়াবাসীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের চাউল ভাত লাগবে না। কিন্তু বাচ্চাদের বাঁচাতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে। তাহলে পাহাড়ধস, পর্বতের মাটি পানি ধরে রাখতে না পারা, নির্বিচারে গাছ কাটা ইত্যাদি কারণে বৃষ্টির পানি যখন তীব্র শক্তি নিয়ে নিচে নেমে আসে তখন কোনো পাড়া বা গ্রামে আটকে গেলে সেটি নিষ্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে বলে প্রতীয়মান। এদিকে চেঙ্গী, মাইনিংয়ের মতো সাঙ্গু, মাতামুহুরিতেও পলি ভরাটের কারণে পানির প্রবাহ কমে গেলে নিচের দিকে বা সমুদ্রের দিকে দ্রুত যেতে পারে না। সমুদ্রের পানির উচ্চতাও প্রতিবছর বাড়ছে। মুহুরিঘাটের মতো সমুদ্রের মুখে বেড়িবাঁধগুলোও পানি চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা–এসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত। তার মানে সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও পাহাড়ের পানি দ্রুত সমুদ্রে গিয়ে মোহনায় মিলিত হতে পারে না।
চট্টগ্রাম শহরকে এখন জলাবদ্ধতামুক্ত করার জন্য সরকার কার্যকর কোনো প্রকল্প নিতে পারছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এখনও সময় আছে। জেনে রাখুন, পাহাড়ের ভেতরে নিচের অংশে এমন কতগুলো ছোট পাড়া আছে যেসব পাড়া চারদিকে বড় বড় পাহাড়বেষ্টিত। পাশের বড় পাহাড়টি ধসে পড়লে পুরো পাড়াটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যাবে। তখন কে কাকে দোষ দেবে? উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট সরকার চাইলেও পৌঁছাতে পারবে না। আমার এ কথা শুনে অনেকে যুক্তি দেবে, সেখানে তো পাথর আছে। সহজে ধসে পড়বে না। পাথরতো বিভিন্নভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে। আর পাহাড়ের চূড়ায় তো এখন আগের মতো গাছ নেই। ‘ন্যাড়া পাহাড়’ বলে কথাটি প্রচলন হয়ে গেছে। ব্যাপক গাছ রোপণ করে বন সৃষ্টি করতে না পারলে ওপরের মাটি তো ধসে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে আমবাগান করতে গিয়ে উঁচু পাহাড়গুলো ভেঙে পড়েছে। বাগানের গাছের মূল মাটির গভীরে না যাওয়ায় পাহাড় ধসের মতো ঘটনা ঘটে। সেসব বড় আকারে হয়নি বলে তেমন আলোচনা নেই। তাই বড় পরিকল্পনা না নিলে সামনে মহাবিপদ আছে। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব বিবাদ করে তো অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এবার প্রকৃতি নিয়মিত প্রতিশোধ নিচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ উপায় দ্রুত খোঁজা উচিত। এভাবে প্রতি বছর বৃষ্টির পানি বাড়তে থাকলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। মানুষজন নানা সমস্যায় নিমজ্জিত হতে থাকবে।
ইতোমধ্যে দেখলাম, বান্দরবানের এমপি সাচিংপ্রু জেরি পাহাড়ের পানি সমস্যা সমাধান করতে তিনি ভূগর্ভস্থ পানিকে কীভাবে উত্তোলন করে পাহাড়ের ওপরে বসবাসকারী লোকজনকে বিতরণ করে সমতলবাসীকেও দেওয়া যায় সে ব্যাপারে সংসদে কথা বলেছেন। কারণ, গরমকালে পানির অভাবে পাহাড়ের ওপরে লোকজনকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এখন বৃষ্টির পানিকে কী ধরনের উন্নত ব্যবস্থাপনা করলে পাহাড়ের লোকজন বন্যার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে সে ব্যাপারে জোরালো প্রস্তাব পাহাড়ের চার এমপির সংসদে উত্থাপন করা উচিত। নাহলে প্রতি বছর পাহাড়বাসীকে পানিতে ডুবে কষ্ট পেতে হবে।
উশ্যেপ্রু মারমা: লেখক ও সাবেক জনপ্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি