অন্যদৃষ্টি
ব্যক্তিগত ডেটার অপব্যবহার
মো. শরিফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতার কারণে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির সার্ভারে জমা হচ্ছে। নাগরিকরা বিশ্বাস ও নিরাপত্তার স্বার্থে নাম, ঠিকানা, জেন্ডার, পেশা ও ফোন নম্বরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করলেও গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যাপলের মতো বিগ টেক কোম্পানিগুলো সেই আমানতদারিতা ও গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা কতটা ধরে রাখতে পারছে, তা নিয়ে বর্তমানে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
আমরা কোনো অতিরিক্ত ফি বা টাকা ছাড়াই ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার বা টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যম ও উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করলেও এর পেছনে রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্যিক হিসাব। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ডেটার মার্কেট ভ্যালু বা বাজারমূল্য অত্যন্ত বেশি। যে কারণে বর্তমান বিশ্বে ডেটাকে ‘ডিজিটাল তেল’ বলা হয়। টেক কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এবং স্ক্রিন টাইম বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল সার্ভিলেন্স বা নজরদারি চালায়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আবেগ, অনুভূতি ও চাহিদার একটি সূক্ষ্ম প্রোফাইল তৈরি করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অর্থের বিনিময়ে ডেটা সরবরাহ করা হয়। ফলে একজন ব্যবহারকারী গুগল বা ফেসবুকে যা খোঁজেন, পরে অলৌকিকভাবে সেই সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন ও রিলস ভিডিও তাঁর স্ক্রিনে আসতে থাকে। এভাবে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার আড়ালে নাগরিকদের তথ্যকে ব্যবসায়িক পণ্যে রূপান্তর করে কোম্পানিগুলো যৌথ ব্যবসা ও মুনাফা লুটছে, যা মানুষকে এক প্রকার ‘ডিজিটাল দাস’ বানিয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্যের এই ঝুঁকি শুধু বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই এর ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশে নাগরিকদের তথ্য সংরক্ষণের প্রধান দুটি প্রতিষ্ঠান হলো বিটিআরসি এবং এনটিএমসি, যেখানে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও টেলিফোন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জমা থাকে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই একাধিকবার সংবেদনশীল তথ্য চুরি, ডার্ক ওয়েবে কলরেকর্ডসহ নানা গোপন তথ্য বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে নির্বাচন কমিশনের ডেটা সেন্টার থেকে প্রায় ১১ কোটি নাগরিকের তথ্য ফাঁস এবং ২০২৪ সালে এনটিএমসির সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তার শাস্তি এর অন্যতম উদাহরণ। সংবিধানে নাগরিকদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা টাকার লোভে ভক্ষক বনে গেলে দেশের নিরাপত্তা ও কাঠামো ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ডেটা ফাঁসের ইতিহাস বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৭ সালের কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা স্ক্যান্ডাল এর বড় প্রমাণ, যেখানে একটি অ্যাপ ব্যবহার করে প্রায় ৮ দশমিক ৭ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁস করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন আধুনিক স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে ভিনদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও প্রতিপক্ষ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের ওপর নজরদারি চালায়। আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার তথ্য পাবলিকলি লিক হয়ে গেলে তা চিরতরে অনলাইনে থেকে যায় এবং মুছে ফেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। যে কোনো অ্যাপ, সফটওয়্যার বা ভিডিও গেম ইনস্টল করার সময় ব্যক্তিগত তথ্য বা অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শক্তিশালী আইন ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘জিডিপিআর’-এর মতো কঠোর আইন কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার সুরক্ষা আইন থাকলেও ডেটা সুরক্ষায় শক্তিশালী ও দৃশ্যমান প্রয়োগের অভাব স্পষ্ট। পরিশেষে ডেটা প্রাইভেসি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা রক্ষায় সরকার ও টেক কোম্পানিগুলোর কঠোরতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ অতীব জরুরি।
মো. শরিফুল ইসলাম: শিক্ষক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি