দণ্ডিতদেরও পদোন্নতি
প্রশাসনিক অনিয়মের পুনরাবৃত্তি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
একযোগে ১৭৯ উপসচিবের যুগ্ম সচিবরূপে পদোন্নতির খবর প্রশ্ন তুলিয়াছে– যোগ্যতা, না আনুগত্যের মূল্য অধিক? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হইয়া বিএনপি ক্ষমতাসীন হইবার পর প্রশাসনে ইহাই সম্ভবত সংখ্যাগত দিক দিয়া সর্ববৃহৎ পদোন্নতি তালিকা। এই দীর্ঘ তালিকাতেও বাদ পড়িয়াছেন একটি ব্যাচের মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অধিকারী দুইজন। অন্যদিকে তালিকায় স্থান পাইয়াছেন এমন কর্মকর্তাগণ, যাহারা পূর্বে দুর্নীতি ও অসদাচরণের কারণে দণ্ডিত হইয়াছেন। এমনকি উপসচিব হিসাবে অবসরে গিয়াও কেহ কেহ প্রত্যাবর্তন করিতেছেন যুগ্ম সচিব হইয়া। পদোন্নতির ন্যায় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া তাই হইয়া উঠিয়াছে প্রশাসনিক বৈষম্য ও অনিয়মের খবর। প্রশ্ন উঠিয়াছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা লইয়াও।
সমকালের শনিবারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, রাজধানীর ডেমরায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হইয়া তিন বৎসর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত থাকা কর্মকর্তা এইবার উপসচিব হইতে যুগ্ম সচিব হইয়াছেন। তালিকার অপর কর্মকর্তা নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহালের ইজারা গ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়াই অর্থপ্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করিয়াছিলেন। অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় তাঁহাকে এক বৎসরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দণ্ড দেওয়া হইয়াছিল। বিপরীতে বাদ পড়িয়াছেন দুইজন যোগ্য কর্মকর্তা। ইহাতে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই লইয়াই প্রশ্ন উঠিয়াছে।
স্মরণ থাকিবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বৎসরে অবসরে যাওয়া ৭৬৪ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হইয়াছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। জনপ্রশাসনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ অতিরিক্ত সচিব হইতে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের বঞ্চিত সাব্যস্ত করা সঠিক কিনা– সেই প্রশ্নও উঠিয়াছে তখন। সমর্থকেরা স্মিত হাসিয়া বলিয়াছিলেন, উহা ক্ষতিপূরণ মাত্র। ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে পদোন্নতি লইয়াও শুরু হইয়াছিল সমালোচনা।
এই দেশে প্রশাসনে পদোন্নতি লইয়া বিতর্ক নূতন নহে। অতীতেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক বিবেচনা, পক্ষপাত কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠিয়াছে বারংবার। ২০০১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এবং বিশেষত ২০০৯ সালের পর প্রশাসনে ব্যাপক পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং পদোন্নতি-বঞ্চনার অভিযোগ বহুল আলোচিত। কিন্তু পুনস্থাপিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নূতন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর উহার পুনরাবৃত্তি আমাদিগকে শুধু বিস্মিত নহে, ব্যথিতও করিয়াছে। ইহার সহিত প্রশাসনের জবাবদিহির নাজুকতাও উদ্বিগ্ন করিয়াছে। সরকারি চাকরি আইন-২০১৮তে সরকারি কর্মচারীদের সততা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। আইনটির উদ্দেশ্যই প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। সেই আইন ও বিধিমালার চেতনার সহিত শাস্তিপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিবার সিদ্ধান্ত কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হইতে পারে– তাহাই বৃহৎ প্রশ্ন।
প্রশাসনে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ বা অনিয়মের কারণে কাহারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার উদ্দেশ্য অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি এবং নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পরে যদি সেই ব্যক্তিকেই পদোন্নতি দেওয়া হয়, তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবেই– পূর্বের শাস্তির যৌক্তিকতা কোথায়? এই সকল সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত জায়গা হইতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া থাকেন সেই সকল কর্মকর্তা, যাহারা দীর্ঘদিন ধরিয়া সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করিয়া আসিতেছেন। এই ব্যক্তিগত ক্ষতি হইতেও বড় দুর্যোগ রাষ্ট্রের। প্রশাসনিক পদোন্নতি নিছক ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নহে; শাসনব্যবস্থার ন্যায্যতা, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সহিত সম্পর্কিত। তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত হইবে দ্রুত এইরূপ প্রশ্নবিদ্ধ পদোন্নতি তালিকার উপযুক্ত ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়