ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নীরব প্রস্থান’

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নীরব প্রস্থান’
×

ব্রহ্মা চেলানি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

পেন্টাগন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে ‘ইন্দো’ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের অন্যতম প্রভাব বিস্তারমূলক আমলাতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। সরকারিভাবে অবশ্য কিছুই বদলায়নি। নতুন করে নামকরণের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের দায়িত্বাধীন এলাকা আগের মতোই রয়েছে।

কিন্তু ভূ-রাজনীতিতে নীতিগত নথির মতো অনেক সময় প্রতীকের মাধ্যমেও রণকৌশল প্রকাশ পায়। এখানে নামগুলো কখনোই কেবল বাহ্যিক কোনো প্রসাধন বা সাজসজ্জা নয়; এগুলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে; মিত্রতা গড়ে তোলে এবং সরকারগুলো বিশ্বকে কীভাবে দেখছে, তা প্রকাশ পায়। কেবল একটি উপসর্গ মুছে দিয়ে ওয়াশিংটন এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলগত দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রায় এক দশক ধরে চীন নীতিকে পরিচালিত করেছে; ওয়াশিংটন কি নীরবেই তা থেকে সরে আসছে? আসলে সেই দূরদৃষ্টি কখনোই কেবল ভূগোলের সীমানায় আটকে ছিল না।

‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ছিল একটি মহৎ কৌশলগত ধারণা। এটি স্বীকার করে নিয়েছিল, বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে এবং এটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে একটি অবিচ্ছেদ্য কৌশলগত থিয়েটার বা বলয়ে যুক্ত করেছিল। বিশ্বের ব্যস্ততম নৌপথ, দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি, প্রধান উৎপাদন হাব এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক ফ্ল্যাশপয়েন্টগুলো একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।
এই ভাবনার মূল রূপকার ছিলেন জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর মিলে ‘দুই সাগরের এক অভূতপূর্ব মিলন’ ঘটেছে, যার নিয়মভিত্তিক আঞ্চলিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সমুদ্রনির্ভর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একটি জোট প্রয়োজন। তাঁর ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার উদ্দেশ্য চীনকে বিচ্ছিন্ন করা ছিল না, বরং এশিয়ায় একক কোনো শক্তির আধিপত্য বিস্তার রোধ করা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণাই বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন কৌশলের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ‘কোয়াড’, যা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে এক ছাতার নিচে এনেছে, তা পুনরুজ্জীবিত করা হয়। চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সমীকরণে ভারত এক অভূতপূর্ব গুরুত্ব পায়। কারণ ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান চীনের পশ্চিম প্রান্তে, আর জাপান রয়েছে পূর্ব প্রান্তে। একসঙ্গে মিলে তারা দুটি মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত একটি বৃহত্তর ভারসাম্য রক্ষাকারী জোটের দুই প্রান্তের খুঁটি হিসেবে কাজ করেছিল।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মূলত সেই কাঠামোটি বজায় রেখেছিলেন। যদিও ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বারবার যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সামরিক ব্যবস্থাপনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে, তবুও অন্তর্নিহিত কৌশলগত ধারণাটি অপরিবর্তিত ছিল। ধারণাটি হলো, রাশিয়া নয়, চীনই একবিংশ শতাব্দীর প্রধান ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আজ সেই ধারণা দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। পেন্টাগনের এই নাম পরিবর্তন আসলে বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত মাত্র। ট্রাম্প ক্রমাগত চীনের প্রতি তাঁর অবস্থান নরম করছেন এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘লেনদেন বা চুক্তিভিত্তিক’ সম্পর্কের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তাঁর প্রশাসন কোয়াডের গুরুত্বও কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর মুখে বারবার ‘জি-২’ (গ্রুপ অব টু) বা দুই পরাশক্তির জোটের কথা শোনা যাচ্ছে। এটি বিশ্ব রাজনীতির এমন এক উদীয়মান রূপরেখা নির্দেশক, যা ওয়াশিংটনের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জোটভিত্তিক কৌশল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

ব্রহ্মা চেলানি: ওয়াটার: এশিয়া’স নিউ ব্যাটলগ্রাউন্ড বইয়ের লেখক; দ্য হিল থেকে
সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×