ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি

গ্যাস খাতে ‘অপ্রত্যাশিত’ সংকট এবং প্রত্যাশিত সাড়া

গ্যাস খাতে ‘অপ্রত্যাশিত’ সংকট এবং প্রত্যাশিত সাড়া
×

হাসান মামুন 

হাসান মামুন 

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমার সঙ্গে চাহিদাও কমলে একটা ভারসাম্যে থাকা যেত। সেটা হওয়ার নয়। গ্যাসের চাহিদা বাড়াই স্বাভাবিক। আর তা পূরণের জন্যই বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছিল। দামও ছিল কম। এলএনজি এনে সেটা রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য দুটো ভাসমান টার্মিনালও স্থাপিত হয়েছিল। তাতে পরিস্থিতি কোনোমতে সামলানো গেলেও দুটি ঝুঁকি থেকে গিয়েছিল। এক, সহনীয় দামে এলএনজি আমদানি। দুই, টার্মিনালগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় সচল রাখা। এর যে কোনো একটি বিকল হলেই দেখা দেওয়ার কথা গ্যাসের অসহনীয় সংকট। হালে সেটাই ঘটেছে।
বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুটো টার্মিনাল একযোগে বিকল হওয়াও বিচিত্র নয়! বিশেষজ্ঞরা তাই জোর দিচ্ছেন স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তেমন পরিকল্পনা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কোনো অগ্রগতি হয়নি। যে দুটো প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে কাজ করছে, তাদেরই আরও দুটো টার্মিনাল প্রতিষ্ঠা করার কথা। এর দুটোই বাতিল হয়ে যাওয়ার ‘কারণ’ রয়েছে। তবে বিরাজমান সংকটে বিকল্প উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগ শাসনামলে অর্থবহ অগ্রগতি ছিল না। অন্তর্বর্তী শাসনামলে টেন্ডার ডাকা হলেও তেমন সাড়া মেলেনি। এ অচলাবস্থায় গ্যাসের চাহিদা কম দেখিয়ে; নতুন সংযোগ না দিয়ে; এক খাতে কমিয়ে, আরেক খাতে সরবরাহ বাড়িয়ে সামলানো হচ্ছিল পরিস্থিতি। 

এভাবে একটা দেশ চলতে পারে কিনা– সেই প্রশ্ন ওঠা উচিত। আমাদের যেটুকু ‘উন্নয়ন’ আজতক হয়েছে, তাতে দেশে প্রাপ্ত গ্যাসের অবদান বিরাট বৈ কি। কালক্রমে এর পরিমাণ কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও হয়তো ভুল ছিল না। এর পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার না করে এলএনজিনির্ভর থেকে যাওয়া হয়েছে আত্মঘাতী। ইউক্রেন যুদ্ধে দাম বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন আমরা ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখতেও বাধ্য হই। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আমদানির ব্যবস্থা অবশ্য করেছিল তৎকালীন সরকার। হালে ইরান যুদ্ধে সেটাও স্থগিত হয় হরমুজ প্রণালি সংকটে। সেখানকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এলএনজির বৃহত্তম উৎস থেকে বলা হচ্ছে, এ বছর তারা বড়জোর প্রতিশ্রুতির অর্ধেক দিতে পারবে। কারণ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামতে সময় লাগবে। 
জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত যে কঠিন, সেটা হালে আমরাও বুঝতে পারছি। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় চালু করতে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে লোকবল। দেশে এমন মানের লোকবল নেই, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের ওপর ভরসা করতে নারাজ– সেটা অবশ্য অস্পষ্ট। আরও সমস্যা, দীর্ঘ সময়েও আমরা নির্ভর করে আছি মাত্র দুটো এলএনজি টার্মিনালের ওপর। এটা তখনও, যখন অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ অব্যাহতভাবে কমছে। এ ক্ষেত্রেও আবার বিদেশি কোম্পানি পরিচালিত একটি গ্যাসক্ষেত্রের ওপর আমরা বেশি নির্ভরশীল। তাতে কোনো সংকট দেখা দিলেও বিপদে পড়ব। এ অবস্থায় জরুরি ছিল সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরালো করা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়ানো। 

গ্যাস একেবারে পাওয়া যায়নি, তা অবশ্য নয়। তবে ভোলায় গ্যাস মিললেও তা শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হলেও শিল্পে চাহিদাও কম নয়। শিল্পকে বঞ্চিত করে, এমনকি সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস জোগানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাস শিল্পাঞ্চলে আনার উপায় নিয়ে সিরিয়াস ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে হালে। ভোলায় শিল্পকারখানা গড়ে গ্যাস ব্যবহারের কথাও কম হচ্ছে না। সেখানে কিছু বিনিয়োগও হয়েছে। এদিকে কিছু বিজনেস গ্রুপ বড় বিনিয়োগ করে গ্যাস সংযোগ না পেয়ে বিপদে পড়েছে। উৎপাদনে যেতে না পারায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না; ব্যাংকগুলোও ‘বিশ্বস্ত’ এসব গ্রাহক নিয়ে পড়েছে সংকটে। এ অবস্থাতেই গতকাল খবর মিলল, সরবরাহ বাড়ার আগ পর্যন্ত শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ দেবে না সরকার। 
যেসব শিল্প সংযোগ পেয়েছিল, তারাও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। পেলেও নির্দিষ্ট চাপে পাচ্ছে না বলে অভিযোগ। একটি এলএনজি টার্মিনাল বসে পড়ায় আমদানি করা গ্যাসের ৫০ শতাংশের বেশি মিলছে না। এটা আসলে চলমান সংকটে নতুন মাত্রা। তাতে বাসাবাড়িতেও সংকট দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেকে অবশ্য ইতোমধ্যে এলপিজিতে অভ্যস্ত। অনেকে বিদ্যুৎ চালিত চুলায় রাঁধছেন; তাতে খরচ বেশি। সিএনজিচালিত বাহনগুলোও সংকটে পড়েছে গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে। তাতে অনেকেরই জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত। 

গ্যাস সংকটে গ্যাসভিত্তিক অর্ধেক সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্রই নাকি বন্ধ হয়ে গেছে। স্বভাবতই কমেছে উৎপাদন। লোডশেডিং নতুন করে বেড়েছে গ্রামাঞ্চলে। সবখানে সমান লোডশেডিং দেওয়া হবে– এমনটা মুখে বললেও তা কার্যকর করা কঠিন। শিল্পাঞ্চলে একযোগে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমলে বিপদ। প্রবৃদ্ধি তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কমবে কর্মসংস্থান। এমনিতেই গেল অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিতে শিল্পের অবদান কমেছে অনেক। এটি বহাল থাকলে চলতি অর্থবছরে এর যে লক্ষ্যমাত্রা, তার ধারেকাছেও যাওয়া যাবে না। শিল্পের আরও কিছু সমস্যা রয়েছে, যাতে অবধারিতভাবে ভুগছে রপ্তানি খাত। গতকালের সমকালে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের অভিঘাতের যে চিত্র এসেছে, তা উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় ডিজেলসহ বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতায় খরচ যাচ্ছে বেড়ে। স্বভাবতই বেড়েছে সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তা। পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে থাকতে না পারা এবং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও মিলছে বেশি। 

মন্দের ভালো খবর, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে এবং এতে জ্বালানির বাজার শান্ত। আমদানিনির্ভর আমরা এর সুফল পাব দাম আরও নিম্নগামী হলে। দেশে কিছু জ্বালানির দাম কমানোও যাবে তখন। কম দামে বাড়ানো যাবে এলএনজি আমদানি। তবে এটা দ্রুত বাড়িয়ে বেশি গ্যাসের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। নতুন তিনটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থাকলেও এর বাস্তবায়নে সময় লাগবে। অন্তত চলতি অর্থবছরে সেটা নাকি অসম্ভব। এদিকে অনুসন্ধান করে গ্যাস মিললেও সেটা ব্যবহারযোগ্য করতে লেগে যাবে কয়েক বছর। এ অবস্থায় ‘রেশনিং’ করেই চলতে হবে। এমনকি ইউরিয়া সার  বেশি করে আমদানি করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়াতে হবে কয়লার ব্যবহারও। শিল্পের প্রত্যাশিত সম্প্রসারণ ঘটবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও হবে নিরুৎসাহিত। রান্নায় আরও বাড়বে এলপিজির ওপর নির্ভরতা। 
গ্যাস খাতে বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদাসীনতার কোনো সুযোগ নেই। কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি না হয়ে গ্যাস সংকট সামাল দেওয়া গেলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। গ্যাসনির্ভর শিল্পের পাশাপাশি সারাদেশের ক্ষুদ্র শিল্পগুলোও খুব বেশি বিদ্যুৎনির্ভর। গ্রামাঞ্চলের অব্যাহত লোডশেডিংয়ে সেগুলোর অস্তিত্ব হুমকিতে। এরও প্রভাব রয়েছে কর্মসংস্থান আর নিত্যপণ্যের বাজারে। সোলারসহ নবায়নযোগ্য খাত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেটা শর্ত ও সময়সাপেক্ষ। এর আগ পর্যন্ত গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে চলতে যাতে সমস্যা না হয়, সেটাও দেখতে হবে সরকারকে।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক 
 

আরও পড়ুন

×