ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চিকিৎসা

বন্যার্ত নারীর মাসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক

বন্যার্ত নারীর মাসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক
×

আইরিন সুলতানা

আইরিন সুলতানা

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভেজা শরীরে বাঁধে ঠান্ডা-জ্বর। দেখা দেয় চর্মরোগ। চারদিকে থইথই পানি, তবু বিশুদ্ধ পানি সংকটে শুরু হয় ডায়রিয়া। এসব স্বাস্থ্য সংকট আমরা দীর্ঘদিনের বন্যা অভিজ্ঞতায় জেনে গেছি। তাই ফিটকিরি, স্যালাইন, শুকনো খাবার ইত্যাদি সব সময় বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলের ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকে। এতসব প্রস্তুতির ভিড়ে আড়ালে রয়ে যাচ্ছে বন্যাপীড়িত নারীর পিরিয়ড বা মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কর্মপরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা।    

বিশ্বজুড়ে প্রতি মাসে ১৮০-২০০ কোটি নারীর মাসিক হয়, বাংলাদেশে সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮ লাখ নারীর মাসিক চলমান থাকে দেশে। তাই বন্যাপীড়িত অঞ্চলে প্রতিদিনই মাসিক হওয়া নারীর সংখ্যা কম হওয়ার কথা নয়। কোমর পর্যন্ত জলে ডুবে মাসিক চলা নারীই জানেন ওইটুকু সময়ে তাঁর ওপর দিয়ে কী আজাব গেল।      
অন্যদিকে জরিপ বলছে, দেশের ৮৬ শতাংশ নারী মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন মাত্র ১৭ দশমিক ৪ ভাগ। যেটাই পরা হোক, মাসিকের কয়দিন বৃষ্টি থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে হয়। অথচ বৃষ্টি, জলজট ও বন্যার পানিতে হেঁটে, নৌকা করে, প্রায় সাঁতরে গোটা দেশে (চট্টগ্রাম বিভাগ বাদে) লাখ লাখ শিক্ষার্থী গত ১৩ জুলাই এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। সেদিন নারী শিক্ষার্থীরাও কোমরপানি ভেঙে পরীক্ষা দিতে গেছেন। তাদের একাংশের অবশ্যই ওই ১৩ তারিখে মাসিক চলছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যায় ভেসে যেতে যেতে যে নারীর মনে হয় কোথায় একটু পালিয়ে বাঁচবেন, সেই নারী বন্যায় পিরিয়ডের কাপড় ধোবেন কোথায়? স্যানিটারি ন্যাপকিন কোথায় ফেলবেন? আবার কিশোরীর প্রথম মাসিক যদি বন্যাপীড়িত হয়, তবে এই ট্রমা কতদিনে কাটিয়ে উঠবে সে?

বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান বা স্পারসোর পানিসম্পদ বিভাগের অনেক কাজের একটি হলো–দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সহায়তায় বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, নদীর গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্যাদি ও উপাত্ত প্রস্তুতকরণ। টানা কতদিন বৃষ্টি হবে সেই পূর্বাভাস নিয়মিত দিয়ে যায় আবহাওয়া অফিস। এআই যুগে টানা বৃষ্টি, নদীর পানি বিপৎসীমার কত কাছে এবং বন্যার পূর্বাভাস জানার হরেক তরিকা আছে। অর্থাৎ বন্যা কোনোমতেই সরকারের অগোচরে হানা দিচ্ছে না। তাই মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরকে একযোগে বন্যাপীড়িত নারীর মাসিক স্বাস্থ্য সেবানীতি বাস্তবায়নে তৎপর হতে হবে।
সরকারিভাবে বিশেষত বন্যাপীড়িত নারীর মাসিক স্বাস্থ্যসেবা নীতিতে ১০টি কর্মপরিকল্পনা জরুরি হয়ে উঠেছে।

 ১. বন্যার মতো আপৎকালে সরকারি ত্রাণসামগ্রীতে অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের পিরিয়ড ডিভাইস রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. পিরিয়ড ডিভাইস বলতে কী ধরনের উপকরণ থাকবে তা স্পষ্ট হতে হবে; যেমন–দীর্ঘক্ষণ শোষণক্ষমতাসম্পন্ন স্যানিটারি প্যাড, পিরিয়ডকালীন বিশেষ প্যান্টস ইত্যাদি। ৩. গ্রামে শিশুদের সাঁতার শিক্ষায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি অনুসরণ করে দেখেছিলাম, নারী প্রশিক্ষকদের মাসের যে কোনো দিন নির্দ্বিধায় পুকুরে নামা নিশ্চিত করতে তাদের মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এখন পর্যন্ত মেন্সট্রুয়াল কাপই একমাত্র ওয়াটার প্রুফ পিরিয়ড ডিভাইস। বন্যায় মেন্সট্রুয়াল কাপ নারীস্বাস্থ্যের বিড়ম্বনায় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। সরকারি উদ্যোগে বন্যাপ্রবণ এলাকায় মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে নারীদের বছরজুড়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নিতে হবে। ৪. মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইসিডিডিআর,বির একটি গবেষণার কথা জানা যায় ২০১৯ সালে। বিজ্ঞানী ফারহানা সুলতানা একটি বিশেষ কালো ব্যাগ বানিয়েছিলেন, মাসিকে যারা কাপড় ব্যবহার করেন তারা কালো ব্যাগের ভেতরে হাতের স্পর্শ ছাড়াই কাপড়টি ধুতে পারবেন। ধোয়ার পর বিশেষ ব্যাগে ভরে রোদে শুকানো যাবে। এই রকম গবেষণায় সরকারকে নিজ উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষক হতে হবে বন্যাপীড়িত নারীর স্বার্থে। এই বিশেষ ব্যাগ বন্যাপীড়িত নারী পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। ৫. যারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছেন তারা এটি কোথায় ফেলবেন, সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুস্পষ্ট হতে হবে। পিরিয়ডে ব্যবহৃত প্যাড বিশেষ করে বন্যার সময় স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে অপসারণ করতে হবে। ৬. বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মাসিক ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট লোকবল ও সরঞ্জামাদি থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নারীর জন্য আলাদা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট, স্যানিটারি প্যাড, মেন্সট্রুয়াল কাপ, সাবানের ব্যবস্থার পাশাপাশি মাসিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। ৭. ভেজা কাপড়ে থাকা, দীর্ঘক্ষণ স্যানিটারি প্যাড পরে থাকা, ঠিকমতো মাসিকের কাপড় না ধুয়ে পড়ার কারণে বন্যা-পরবর্তী সময়ে মেয়েলি রোগের মাত্রা বাড়তে দেখা যায়। তাই বন্যাপীড়িত এলাকায় নারীর প্রজনন অঙ্গ ও ত্বকে সংক্রমণ, চুলকানি ও রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীর স্বাস্থ্য তথ্য নিতে হবে। ৮. বন্যায় নারী স্বাস্থ্যের দুর্ভোগ, জরুরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা ও জরিপ পরিচালনা করতে হবে। বন্যা শেষে তথ্য-পরিসংখ্যান উন্মুক্ত করে কার্যক্রম কোথায় কতটুকু সফল ও ব্যর্থ হলো তা আলোচনার সুযোগ করে দিতে হবে। ৯. অতিবৃষ্টি ও বন্যার মৌসুমে পাবলিক পরীক্ষা, সরকারি চাকরির পরীক্ষার মতো গণঅংশগ্রহণমূলক আয়োজনের তারিখ কোনোভাবেই রাখা যাবে না। ১০. বন্যায় মাসিক ব্যবস্থাপনার সব দিক নিয়ে সচেতন করতে এবং এ-সংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগ নিয়ে অবগত করতে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে।

আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশের নীতিনির্ধারণী টেবিল-চেয়ারে পুরুষের আধিক্য। নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় টপ ভিউ থেকে। নারী স্বাস্থ্য নিয়েও কার্যক্রম হয়। কিন্তু  যে দেশের সমাজ ও পরিবারে মেয়েলি রোগ পুরুষের অগোচরে রাখা হয়, সেই পুরুষ যখন নীতিনির্ধারক হন, তাঁর পক্ষে বন্যাপীড়িত নারীর মাসিকে শারীরিক ও মানসিক বিড়ম্বনা বোঝা কঠিন বৈকি। ফলে নারী-পুরুষের একটি সম্মিলিত গোলটেবিলে বন্যার্ত নারীর মাসিক স্বাস্থ্যসেবা নীতি অনুমোদন আজকেই জরুরি আলাপ হয়ে উঠেছে।

আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×