ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণঅভ্যুত্থান

আওয়ামী লীগের পরিণতি অন্যদের জন্যও শিক্ষণীয়

আওয়ামী লীগের পরিণতি অন্যদের জন্যও শিক্ষণীয়
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিনষ্ট হলে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তার উদাহরণ অনেক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চরম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। ১৯৯০ সালেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে একটি সরকারের পতন ঘটে। তবে তাতে ঘটেছিল অনেক কম রক্তক্ষয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি উপায়ও বের করা হয় আলোচনার মাধ্যমে। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনেও খুব কম সময় নিয়েছিল তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার। 

সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারটি দেড় বছরের মতো সময় নিয়েছে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য। ক্ষমতাচ্যুতদের অপরাধী অংশের বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার এগিয়ে নিতে গিয়ে নির্বাচন আয়োজনে বেশি সময় লেগেছে বলা হলেও এতে সবাই একমত হবেন না। তা সত্ত্বেও প্রায় সবাই বলবেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়েই বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর চেয়ে ভালো নির্বাচন সম্ভবপর ছিল না। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা সময়টি নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। একেক পক্ষ একেকভাবে মূল্যায়ন করবে; সেটাও স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় তাদের কাজেরও কিছুটা মূল্যায়ন হবে। কোন সরকার কেমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে, সেটা মাথায় রেখে মূল্যায়ন করাই সংগত। প্রেক্ষাপট মূল্যায়নে অবশ্য সবাই একমত হবেন না। 

কী হতে পারত, সে দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেকে আলোচনা করে থাকেন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় যান অনেকে। সে ক্ষেত্রেও বলতে হয়, একেক দেশের পরিস্থিতি আলাদা। গণঅভ্যুত্থানের কারণও অভিন্ন নয়। তা ছাড়া একেক দেশে একেক শক্তি নেতৃত্ব দিয়েছে গণঅভ্যুত্থানে। সেটা প্রতিহত করতে সবখানে আবার একই রকম শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর একেক দেশে একেক পক্ষ এসে মাঠ দখল করেছে। একেক দেশ আবার একেক প্রক্রিয়ায় গেছে উত্তরণের দিকে। কোনো কোনো দেশ গণতন্ত্রে ফিরতে না পেরে ডুবেছে নতুন সংকটে। 

বাংলাদেশে তেমন কিছু ঘটেনি বলে কাকে ‘ধন্যবাদ’ দিতে হবে, সেটা অবশ্য বলা মুশকিল। মোটাদাগে এ দেশের মানুষ অনুমোদন করেনি অরাজকতা; সাড়া দেয়নি নিয়মতান্ত্রিক উপায় বিসর্জনের ডাকে। ক্ষমতাচ্যুতদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে শাস্তিমূলক পদক্ষেপও তারা ভালোভাবে নেয়নি। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফল এর প্রমাণ। মাঠে থাকা একটি মধ্যপন্থি দলকেই জনগণ জয়যুক্ত করেছে এই ভরসায় যে, তাতে দেশটির অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র অন্তত অক্ষুণ্ন থাকবে। 

‘উদারপন্থি’ বলে পরিচিত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বারবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে অবনমন ঘটিয়েছে, সে জন্য একাধিকবার হোঁচট খেয়েছে তারা। জাতিও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আওয়ামী লীগে অনুশোচনা ও শিক্ষা গ্রহণের লক্ষণ অবশ্য অনুপস্থিত। প্রথমবার নিজেরাই নিজেদের বিলুপ্ত করে আশ্রয় নিয়েছিল একদলীয় ব্যবস্থায়। দ্বিতীয়বার গণঅভ্যুত্থানকারীরা এসে ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করে দলটিকে সোপর্দ করেছে বিচারে। এমন পদক্ষেপে অবশ্য সবাই একমত নন। তবে এ অবস্থায় দলটির পক্ষে নতুন করে সংগঠিত হয়ে শিগগিরই রাজনীতিতে ফেরা কঠিন বলেই প্রতীয়মান। 

এমন পরিণতি থেকে মাঠে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ মেয়াদের পর মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে অগণতান্ত্রিক যা কিছু করেছে, সেগুলো সতর্কভাবে পরিহার করা উচিত বিশেষত ক্ষমতাসীনদের। সম্পূর্ণ নতুন ধারায় চলা অবশ্য সুকঠিন। সে ক্ষেত্রে যে অপরাধটি থেকে শত হাত দূরে থাকতে হবে, তা হলো নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ। এটাকে শক্তিশালী করতে যা যা প্রয়োজন, সেসব বরং করতে হবে। পাকিস্তান আমলেও কিন্তু বিতর্কমুক্ত নির্বাচন হতো; এমনকি যখন নির্বাচন কমিশন কিংবা নির্বাচনী আইন বলতে যা বোঝায়, তা ছিল না। নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের পরাস্ত হতেও দেখা যেত। দুর্ভাগ্য, গণতন্ত্রের জন্য জরুরি ন্যূনতম এ প্রক্রিয়াও আমরা নষ্ট করেছি ১৯৭৩ সাল থেকে। 

এ দেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জরুরি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি উচ্ছেদ না করলে শেখ হাসিনা সরকারকে অন্যান্য অপকর্মে জড়াতে হতো না, এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায়। একটা পর্যায়ে এসে প্রকৃত বিরোধী দলকে সংসদে এনে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের দিকে যাওয়ার সুযোগটিও হারান তারা। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পথও ধরতে হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সত্ত্বেও অর্থনীতিতে থেকে গেছে দগদগে ক্ষত। অর্থনীতির শরীর থেকে সেই সব ক্ষত সারানোও কঠিন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, উত্তরণের দিকে যেতে লেগে যাবে কয়েক বছর। 

গণতন্ত্রে উত্তরণ করা গেছে, এটা অবশ্য কম নয়। মাঝে এমন শঙ্কাও জন্মেছিল, গণতন্ত্রে উত্তরণ বুঝি অনিশ্চিত। একটা সময়ে তাই সংস্কার আলোচনার বদলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও জোর দেওয়া শুরু হয় নির্বাচন আয়োজনে। এর ভেতর দিয়ে যে সরকার এসেছে, তার অবশ্য দায়িত্ব রয়েছে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে, সন্দেহ নেই। ভালো যে, তাদের সঙ্গে সংসদে উপস্থিত বিরোধী দলগুলোরও কিছু ঐকমত্য রয়েছে। সেগুলো ধরে সংস্কারের পথে এগিয়ে যেতে বাধা নেই। তবে সরকারপক্ষে সেই মনোভাব দুর্বল বলে হতাশা বেড়েছে তাদের মধ্যে, যারা নির্বাচনী গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু চান। কেবল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পালাবদল তাদের তুষ্ট করতে পারছে না। 

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর বিভিন্ন স্তরে সেটা হবে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা দেখতে চাইব, কেমন স্থানীয় নির্বাচন হয়। দলীয় প্রতীকের বাইরে এ নির্বাচনকে ‘অধিকতর অংশগ্রহণমূলক’ করা সম্ভব। এটিকে সহিংসতামুক্ত রাখার পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্বই বেশি। এসব নির্বাচন কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনেই হবে। জাতীয় নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনে হওয়াটা নিয়ম– দুনিয়াজুড়ে। এই কাজে আমরা যে শুরু থেকে ব্যর্থ, সেটা আগেই বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক, অন্তত স্থানীয় নির্বাচনটি সরকার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে কিনা। এতে আর যা-ই হোক, সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তারপরও এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের পারফরম্যান্সের এক ধরনের মূল্যায়ন হবে। সেদিক দিয়েও এটাকে সরকারের জন্য পরীক্ষা বলা যায়। 

সংবাদমাধ্যমকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিলে তারাও দেশের সত্যিকার পরিস্থিতি, এমনকি জনপ্রতিক্রিয়া তুলে ধরতে সক্ষম। পেশাজীবী সংগঠনগুলোও যেন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার না হয়ে কাজ করতে পারে। তাহলে খাতওয়ারি সমস্যাগুলো ঠিকমতো জেনে সময়মতো ‘অ্যাড্রেস’ করতে পারবে সরকার। ছোট-মাঝারি খাত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময় শোনা যায় না বড়দের কোলাহলে। ক্ষমতাসীন দল জনসম্পৃক্ত হলে সেই সব কণ্ঠস্বরও সরকারের উচ্চস্তরে এসে পৌঁছাতে পারবে। 

গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত, তার ওপরও যেন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ছায়া এসে না পড়ে। রাষ্ট্র সংস্কারে কত দিনে কতখানি অগ্রগতি হবে কে জানে! তবে জনগণ যেন দেখতে পায় সরকারের স্বচ্ছতা আর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তার জবাবদিহি। মেয়াদ শেষে দেশের মালিক জনগণের সামনে এসে যেন দাঁড়াতে পারে সরকার– সাহসের সঙ্গে। সেটাই বড় কথা।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×