ইসলাম ও সমাজ
রবিউল আউয়ালের তাৎপর্য
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামী বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। আরবি রবি শব্দের অর্থ বসন্ত; আউয়াল অর্থ প্রথম। প্রকৃতির বসন্ত যেমন প্রাণে নতুন স্পন্দন জাগায়, তেমনি রবিউল আউয়াল মানবতার ইতিহাসে এনেছে আধ্যাত্মিক বসন্ত। এই মাস ইমান, ভালোবাসা, শিক্ষা ও মানবতার পুনর্জাগরণের মাস। কারণ এ মাসেই দুনিয়ায় শুভাগমন করেছেন মানবতার মুক্তির মহান অগ্রদূত রহমাতুল্লিল আলামিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, তিনি ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে অন্ধকার যুগের অবসান হয়। যে আরব সমাজে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো; যে সমাজে সুদ, জুলুম, গোত্রীয় কলহ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, সেই সমাজকে তিনি ২৩ বছরে বদলে দিলেন ন্যায়, সাম্য ও মানবতার আদর্শে।
শুধু জন্ম নয়; রবিউল আউয়াল মাসেই তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র মদিনা সনদ ও ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয় এই হিজরতের মাধ্যমে। আবার এ রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখেই তিনি ইন্তেকাল করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ১০৭ আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আমি তো আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’
এ মাসে মুমিন ব্যক্তি বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়েন, সিরাতের আলোচনা করেন, তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করার শপথ নেন। এটি আত্মশুদ্ধির মাস। নবী-প্রেম মানে তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। তাঁর মতো সত্যবাদী হওয়া, আমানতদার হওয়া, গরিব-এতিমের পাশে দাঁড়ানো।
রবিউল আউয়াল আমাদের সামনে সিরাতের আয়না তুলে ধরে। সিরাত মানে শুধু ইতিহাস নয়, একটি জীবন পদ্ধতি। মহানবী (সা.) ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপতি, বিচারক ও শিক্ষক। তিনি শিখিয়েছেন ক্ষমতা মানে মানুষকে শাসন করা নয় বরং ক্ষমতা মানে মানুষকে সেবা করা।
জাহেলি যুগে নারী ছিল পণ্য। মহানবী (সা.) নারীকে জননী, স্ত্রী, কন্যা হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। তিনি গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন; পশুর প্রতি দয়া করতে বলেছেন। যুদ্ধেও শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও উপাসনালয়ে আঘাত করতে নিষেধ করেছেন। আজকের বিশ্ব যখন যুদ্ধ ও জলবায়ু সংকটে, তখন তাঁর এই শিক্ষা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
মহানবী (সা.) সুদকে হারাম ঘোষণা করে শোষণমুক্ত অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছেন। জাকাত, সদকার মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানোর পথ দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালিত হয়। এ দিন সরকারি ছুটি। এই দিন সারাদেশে মিলাদ মাহফিল, দোয়া, আলোচনা সভা, র্যালি ও গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। মসজিদগুলোয় সিরাতের ওপর আলোচনা হয়। শিশুদের মহানবীর (সা.) জীবনের গল্প শোনানো হয়।
রবিউল আউয়াল প্রকৃতির বসন্ত নয়; এটি মানবতার বসন্ত। এ মাস এসে আমাদের জিজ্ঞেস করে– তুমি কি সেই নবীর উম্মত হতে পেরেছ, যিনি ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়েছেন; এতিমের মাথায় হাত রেখেছেন; সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবেই আমাদের মিলাদ ও দরুদের সার্থকতা। আর যদি না হয়, তবে এ মাস আমাদের তওবা ও পরিবর্তনের সুযোগ। তাই আমাদের এ মাসের প্রধান কাজ হবে মহান আল্লাহর নিকট বিগত দিনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবাসার মাপকাঠি হলো তাঁকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁরই খাঁটি অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার