মানবাধিকার কমিশন আইন
নখদন্তহীন ব্যাঘ্র পুনরাবিষ্কার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানবাধিকার কমিশনের নূতন আইনের যেই খসড়ায় মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়াছে, উহাতে মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত হইবে– সেই প্রশ্ন সংগত। এই আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের নিকট না থাকিবার বিষয়টি বিস্ময়কর বটে। বস্তুত সরকার পুরাতন ২০০৯ সালের আইনেই প্রত্যাবর্তন করিয়াছে, যেইখানে অনুরূপ বিধান থাকিবার বিষয়টিই সর্বাধিক সমালোচনার নিশানা হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পূর্বের আইন বাতিল করিয়া মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে তদন্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হইয়াছিল। আমরা মনে করি, অধ্যাদেশটি পাস না করাইয়া পুরাতন আইনে প্রত্যাবর্তন কেবল মন্দ নজিরই নহে; বরং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষারও পরিপন্থি।
জাতীয় মানবাধিকার আইন ২০২৬-এর খসড়ায় যদিও বলা হইয়াছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ইহার সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পাইলে কমিশন সরকারের নিকট প্রতিবেদন চাহিতে পারিবে এবং প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট না হইলে করণীয় সম্পর্কে সরকারের নিকট সুপারিশ করিতে পারিবে। ইহার শুরুতেই স্বাধীন তদন্তের পথ রুদ্ধ করিবার ফলে অভিযুক্ত বাহিনীর প্রতিবেদনের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো তদন্তলব্ধ তথ্য-প্রমাণ থাকিবে না। উপরন্তু পত্র বিনিময় করিতেই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি লোপাট হইবার আশঙ্কা থাকে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে আমরা দেখিয়াছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই সংশ্লিষ্ট ছিল। গুম, খুন ও ক্রসফায়ারে হত্যা, বেআইনি আটক, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ইত্যাদি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ঘটাইয়াছে। মানবাধিকার কমিশন যে ঐ সকল গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি বা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখিতে পারে নাই মূলত মানবাধিকার আইনের দুর্বলতার কারণে। বলা বাহুল্য, সেই কারণেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কখনোই ‘ক’ শ্রেণির অবস্থান অর্জন করতে পারে নাই।
আমরা দেখিয়াছি, বর্তমান সরকার এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করিবার পর মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য পদত্যাগ করেন। দুঃখজনক হইলেও সত্য, সরকার এই প্রতিষ্ঠানে অদ্যাবধি চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যদের নিয়োগ দেয় নাই। তিন মাস ধরিয়া গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা দুঃখজনক। এখন সরকারের পাঁচ মাসে আসিয়া মানবাধিকার কমিশনের যেই আইন অনুমোদিত হইল, উহাতেও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের সদিচ্ছার পরিবর্তে পুরাতন চাতুর্যই নূতন করিয়া স্পষ্ট হইতেছে।
বুধবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আইনটির বিষয়ে উদ্বেগ জানাইয়া যথার্থই বলিয়াছে, সরকার কার্যত মানবাধিকার কমিশনকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিবার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য হিসাবে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন এমপি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পাশাপাশি অন্য যেই তিনজন সদস্য রাখিবার বিধান করা হইয়াছে; তাহাদের মধ্যে দু্ইজনকে মনোনয়ন সরকারের হস্তে রাখিবার ফলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়োগে সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যই নিশ্চিত হইবে।
বিদ্যমান আইনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘন করিলে কী হইবে, সেই বিষয়ে উল্লেখ নাই, যাহা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে ছিল। সব মিলাইয়াই মানবাধিকার কমিশনের নূতন আইন হতাশাজনক। খসড়া আইনে বেশ কিছু ইতিবাচক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হইলেও বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করিবার ক্ষমতা না থাকা এবং কমিশনকে সরকারের পকেটে পুরিবার আয়োজনে কমিশন পূর্বের ন্যায় নখদন্তহীন ব্যাঘ্র হইয়া উঠিবার শঙ্কাই সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা মনে করি, মানবাধিকার সমুন্নত রাখিবার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। তজ্জন্যই সমালোচিত বিষয়গুলি আমলে লইয়া ইহা চূড়ান্ত করা জরুরি। বিপুল প্রাণ, রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অপরাপর প্রতিষ্ঠানের সহিত মানবাধিকার কমিশনেরও সংস্কার প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। বলা বাহুল্য, নখদন্তহীন ব্যাঘ্র পুনরাবিষ্কার নহে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়