ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সমাজ

মাধ্যমিকের ফল এবং মানবিক শিক্ষার তাগিদ

মাধ্যমিকের ফল এবং মানবিক শিক্ষার তাগিদ
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৯ বছরে সবচেয়ে কম পাসের হার নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা রীতিমতো পরিবারগুলোকে স্পর্শ করছে। শহর এবং কিছু কিছু গ্রামের ভালো স্কুলগুলোর ফল নিয়ে কেউ কেউ গর্ব বোধ করছে। আবার কিছু স্কুল ও মাদ্রাসার একটি ছাত্রও পাস করেনি। কোনো কোনো এলাকায় স্কুলের সব ছাত্র এসএসসিতে ফেল করেছে। পরীক্ষায় কম পাসের হারের চেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, অসম শিক্ষাব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মধ্যে প্রকৃত শিক্ষাটি একেবারেই অনুপস্থিত। সাতজন টিউটর রেখে যে ছাত্র জিপিএ ৫ পেল, তার কী কৃতিত্ব আছে? আবার যে ছেলে বা মেয়েটি কোনো গ্রামের স্কুল থেকে প্রাইভেট টিউটর ছাড়াই দ্বিতীয় বিভাগে পাস করল, তার কৃতিত্ব কতটুকু? 

হিসাব করলে দেখা যাবে, গ্রামের ওই ছাত্র বা ছাত্রী যথার্থই তার মেধার গুণে ওই পর্যন্ত পৌঁছেছে। একসময় শিক্ষায় পাসের হার বাড়ানোর জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। এই প্রবণতা প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে খাতা দেখার সময় বিভাগীয় প্রধানরা পরীক্ষকদের উদার হওয়ার জন্য অনুরোধ করতেন। সেই উদারতা এক শিক্ষাবিহীন শিক্ষার জন্ম দিয়েছে। একটু যদি শিশুকাল থেকে আমরা সত্যিকারের শিক্ষার কথা ভাবি, তাহলে দেখব– শিশুটি চোখ মেলছে পাখির গানে, প্রকৃতির টানে, মায়ের স্পর্শে, পিতার স্নেহে। তার দেহটা যখন বড় হচ্ছে, তখন চারপাশের আবহে তার মস্তিষ্কও বিকশিত হচ্ছে। এই মস্তিষ্ক বিকাশের কালে প্রকৃতি, প্রাণিজগৎ এবং আশপাশের মানুষ তাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। এই প্রভাবকে আমরা লালন-পালন বলতে পারি। একটা পর্যায়ে তার জন্য বিদ্যালয়ের দ্বার খুলে যায়। এই সময়ে যা কিছু আনন্দময়, যা কিছু তার ভালো লাগে তার সঙ্গেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু স্কুলে ঢুকেই সে অনুভব করতে থাকে, একটা অদৃশ্য চাপ তার মস্তিষ্কে কাজ করছে। একটি অহেতুক বইয়ের চাপ, আরেকটি পিতামাতার চাপ. যা তাকে স্কুলের শিক্ষার বাইরেও পড়ালেখায় বাধ্য করে। 

উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় ক্লাসরুমের বাইরে কোনো লেখাপড়ার প্রয়োজন হয় না। শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করে, আনন্দময় উৎসবে যুক্ত হয় এবং নানা ধরনের সৃজনশীল শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এখানেই শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির একটা মেলবন্ধন জীবনকে অনেক সৃজনশীল করে তোলে। শিক্ষকরা তাদের নানা ব্যস্ততার মধ্যে সিলেবাসের কার্যক্রমে কেউ কেউ অংশ নেন, তাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শিক্ষা আমলা। তাদের চিন্তার দিগন্ত ক্রমশ সংকুচিত। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে আছে জাতীয় রাজনীতির চাপ। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে নিজেদের মতো সিলেবাস তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। প্রতিটি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি ম্যানেজিং কমিটি। এই ম্যানেজিং কমিটিগুলো সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লোকদের নিয়ে গঠিত। শিক্ষার চাইতে উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা বেশি উৎসাহী। আরও উৎসাহী শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগে। 

সম্প্রতি ভারতে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে ১৮ তরুণের আত্মহত্যা এক বিশাল রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলাফল সারাদেশ উত্তাল; শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আমাদের দেশে পদত্যাগের কোনো নজির নেই। কোনো মন্ত্রী বা প্রশাসন নিজের দোষ কখনোই দেখতে পান না। শিক্ষা যে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন– তা রাজনীতিবিদরা কখনোই মনে করেন না। তাদের প্রধান কাজ শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন ইত্যাদি। শিক্ষার যে প্রশাসনিক কার্যক্রম, তা ঔপনিবেশিক কাল থেকেই চলে আসছে। অশিক্ষক এবং প্রশাসনের লোকেরা শিক্ষকদের ওপর ছড়ি ঘোরান। আমার মনে পড়ে, প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় একবার এসডিও বাহাদুর (মহকুমা প্রশাসক) আমাদের স্কুলে এসেছিলেন। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তটস্থ হয়ে পড়লেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিষয়টিকে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না। ওই শিশু মনে গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়ে আমরা বেশ আনন্দিতই হয়েছিলাম। কিন্তু পাশের স্কুলগুলোতে দেখা গেল, সস্ত্রীক এসডিও বাহাদুরকে ফুলের মালা এবং সংগীত দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। আমাদের স্কুলের তখন একটু ক্ষতিও হয়েছিল। প্রশাসন যথার্থ আনুকূল্য প্রদান করেনি। 

আমরা তখন শিখেছিলাম– শিক্ষক সবার ঊর্ধ্বে। এমনকি জন্মদাতা পিতার চাইতেও বড়। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার জন্য তখন অভিভাবক, স্থানীয় জনগণ নানাভাবে সচেষ্ট থাকতেন। কালক্রমে স্কুল-কলেজগুলো এলাকাবাসীর কাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থান নিয়েছে। কোনো জবাবদিহির প্রয়োজন পড়ে না। অধিকাংশ শিক্ষক তাদের কোচিং সেন্টারের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শুধু তাই নয়, স্কুলে নিজেদের অবসর তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্য করে থাকেন। এর মধ্যে কিছু শিক্ষক তাদের আদর্শবাদ এবং ব্রত নিয়ে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। এসব শিক্ষক ওই সুবিধাবাদী শিক্ষকদের প্রতিহত করারও চেষ্টা করেন। দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক সৎ শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। ওইসব শিক্ষক এক দল উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র নিয়ে প্রকৃত শিক্ষকদের অপমান করতেও দ্বিধা করেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এক সময় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও একবারও এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি এবং ছাত্রদের ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়ার কথা না বলে অটো পাস দিয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এ ধরনের নৈরাজ্য অতীতেও হয়েছে।

আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা দলীয় রাজনীতির প্রশ্নে বিভক্ত থাকে। প্রত্যেকের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। তা এত উচ্চকিতভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার
করে না। 
শিক্ষা থেকে যে মানবিক উৎকর্ষ সমাজকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, তা এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ স্কুল-কলেজের শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষাসহ নানা ধরনের পৃথককরণের ফলে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তাতে সঠিক অর্থে জাতীয় ঐক্য স্থাপন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রয়োজন নম্বরভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নয়; শিক্ষাকে যথেষ্ট মানবিকীকরণের বিষয়টি সমাজকে ভাবতে হবে।

মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব 

আরও পড়ুন

×