ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবাদ’ রাজনীতি

ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবাদ’ রাজনীতি
×

রাফায়েল সাভকো গার্সিয়া

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাজিলের সর্ববৃহৎ দুটি অপরাধী গোষ্ঠী প্রিমেইরো কমান্ডো দ্য ক্যাপিটাল (পিসিসি) ও কমান্ডো ভার্মেলহো (সিভি)-কে ‘সন্ত্রাসবাদী’ গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্য দিয়ে দেশটি মূলত ব্রাজিলের জন্য নিরাপত্তার হুমকি কী– তার নিজের বানানো একটি সংজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে। এই পদক্ষেপের প্রভাব কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক দূর এগিয়েছে। ওয়াশিংটন ও ব্রাজিলের চরম ডানপন্থিরা এই পদক্ষেপকে সংঘটিত অপরাধের ‘বাড়তে থাকা আন্তঃজাতীয় সীমানা’র বিরুদ্ধে একটি ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখালেও বাস্তবে এটি নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতি নিয়েই বেশি কথা বলে।

এই তকমা দেওয়ার ঘটনাটি লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপকারী মানসিকতা। এই ঘটনা ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সালের মার্কিন সমর্থিত সামরিক স্বৈরাচারের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ব্রাজিলের চরম ডানপন্থিদের স্বার্থের মধ্যবর্তী এক বিপজ্জনক সংযোগই তুলে ধরে। 
পিসিসি ও সিভি প্রকৃতপক্ষে ব্যাপক সহিংসতার জন্য দায়ী। তারা লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং ব্রাজিলের ভেতর-বাইরে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু সহিংসতা যতই চরম হোক না কেন, সেটি কোনো সংস্থাকে নিজে নিজেই ‘সন্ত্রাসবাদী’ বানিয়ে ফেলে না। যদিও শব্দটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে সাধারণ বোঝাপড়া হলো, সন্ত্রাসবাদ বলতে রাজনৈতিক বা আদর্শগত লক্ষ্য হাসিলের জন্য পরিচালিত সহিংসতাকে বোঝায়।

পিসিসি ও সিভি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হতে পারে; রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করতে পারে; এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিংবা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। আর তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা অর্জন ও মুনাফা নিশ্চিত করা, কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা নয়। রাজনীতি তাদের কাছে নিজেদের কাজ বাঁচানো এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর একটা মাধ্যম মাত্র; এটি তাদের গড়ে ওঠার মূল কারণ নয়।

সরকারগুলো যত ব্যাপকভাবে এই ‘সন্ত্রাসবাদ’ তকমা ব্যবহার করবে, নিরাপত্তার আসল হুমকির ধরনটা তত বেশি চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ধরনের সংজ্ঞা ব্যবহারের বাড়তি সুযোগ পেয়ে যায়। ঠিক এ কারণেই ওয়াশিংটন কেন এখনই এই পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল– সেই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 
পিসিসি বা সিভি– কোনোটিই নতুন আবিষ্কৃত কোনো হুমকি নয়। পিসিসি ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে বহাল রয়েছে; সিভি আরও পুরোনো। এ দুই সংগঠন এবং তাদের ঘটানো ক্ষতির কথা ব্রাজিল ও ওয়াশিংটন উভয়ই বহু দশক ধরে অবহিত। তাহলে ২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র কেন সিদ্ধান্ত নিল যে, এই বহুদিনের পুরোনো সংঘটিত অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোকে এখন ‘সন্ত্রাসবাদী’ গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত? এর উত্তর সম্ভবত নতুন কোনো নিরাপত্তা মূল্যায়নে নয়, বরং ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে।

এই তকমা দেওয়ার সময়কে প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটনকে পাশে পাওয়ার জন্য বলসোনারো পরিবারের তৎপরতা থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে ২৭ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, অন্যদিকে তাঁর ছেলেরা এই লড়াই দিন দিন যুক্তরাষ্ট্রের দরবারে নিয়ে যাচ্ছেন।

সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো মাসের পর মাস লুলাকে সংঘটিত অপরাধের প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে উপস্থাপন করছেন। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের লুলা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন, যার মধ্যে পিসিসি ও সিভিকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করতে সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজি করানোর চেষ্টাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তাঁর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো তাদের বাবার বিচার চলাকালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ব্রাজিলের ওপর শুল্ক বসানোর জন্য লবিং করে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রচারণায় জবরদস্তির অপরাধে ১৬ জুন ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট এদুয়ার্দোকে চার বছর দুই মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

ফ্লাভিওর লবিংয়ের একটি তাৎক্ষণিক নির্বাচনী গুরুত্বও রয়েছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে লুলার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। ১১ আগস্টের একটি সিএনটি/এমডিএ জরিপ অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোটে লুলা ৪২.৪ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ২৮.৭ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। সেই নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে, এই ‘সন্ত্রাসবাদ’ তকমাটি ব্রাজিলের চরম ডানপন্থিদের ছড়ানো একটি বয়ানকে শক্তিশালী করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সে বয়ানটি হলো, লুলা অপরাধী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আঁতাত করছেন বা তাদের মোকাবিলা করতে অনিচ্ছুক। এর উদ্দেশ্য এই দাবিগুলো সত্যি প্রমাণ করা নয়, বরং এমন একটি সন্দেহের আবহ তৈরি করা যাকে দেশে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবং ব্রাজিলে আমেরিকার আরও বড় ধরনের হস্তক্ষেপ যুক্তিযুক্ত করা যায়।

রাফায়েল সাভকো গার্সিয়া: ব্রাজিলবাসী সাংবাদিক ও গবেষক; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×