রাজনীতি
ছয়টি মাস গেল জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায়
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিএনপি সরকার বর্তমান মেয়াদের ১০ শতাংশ অতিক্রম করার পর এই সময়ের ‘পারফরম্যান্স’ নিয়ে কিছু আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে অবশ্য বলা হয় ‘হানিমুন পিরিয়ড’। বর্তমান সরকার সেটা পায়নি মূলত ইরান যুদ্ধের কারণে। ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে সরকার গঠন হতে না হতেই বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই সরকার খাবি খাচ্ছে জ্বালানি সংকটে। জ্বালানি তেলের পর এলএনজি সংগ্রহে অনিশ্চয়তা; অতিরিক্ত ব্যয়, ভর্তুকি; হালে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা, সেই কারণে গ্যাসের অধিকতর ঘাটতি; তা থেকে আবার লোডশেডিং। কোনো সরকারের পক্ষেই এমন সংকটময় পরিস্থিতির পূর্বানুমান সম্ভব নয়। তবে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মোকাবিলার দায় এসে পড়ে সরকারের ওপর। অনির্বাচিত সরকার থাকলে তাদেরও পরিস্থিতিটা মোকাবিলা করতে হতো। তবে নির্বাচিত সরকারের বেশি করে দায় অনুভবের কথা।
বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে জ্বালানি খাতে কী হয়েছে, সেটা সবার জানা। তারা এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ও রেখে যায়। অন্তর্বর্তী শাসনামলে আবার সেখান থেকে উত্তরণের প্রয়াস ছিল না। তেমন অর্থবহ উদ্যোগ থাকলে নতুন সরকার সেখান থেকে দ্রুত কিছু না পেলেও বলতে পারত, বাড়তি গ্যাস-বিদ্যুৎ পেতে বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। বলতেই হবে, মধ্যবর্তী দেড় বছরে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির মতো জরুরি বিষয়ে কথা হয়েছে কম।
বিএনপির নীতিগত প্রতিশ্রুতি ছিল প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির। দীর্ঘদিন ধরে ‘জবলেস গ্রোথ’ এবং গণঅভ্যুত্থানের পর কর্মহীনতা বাড়ায় এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে তারা বোধহয় বিচার করে দেখেননি, উচ্চ সুদের হার ও নাজুক জ্বালানি পরিস্থিতিতে এত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কীভাবে। বহিঃস্থ কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র না হলেও যে পরিস্থিতি ছিল, সেটাও সন্তোষজনক নয়। গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেখিয়েও তা পূরণের ব্যবস্থা করা যায়নি বিগত সময়ে। এর গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা শিল্প খাত থেকে অভিযোগ আসছিলই।

নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি পরিলক্ষিত হবে বলে যা বলা হয়েছিল, তার লক্ষণ নেই। বেসরকারি খাত থেকে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। এ সুযোগে সরকার অবশ্য বেশি করে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ঘাটতি অর্থায়ন করছে। রাজস্ব আহরণ না বাড়লেও সমস্যা হচ্ছে না। ঋণের সুদ গুনতে যথারীতি বিরাট বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটে। কাঠামোগতভাবে বাজেট আগের মতোই। যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে সরকার জোর দিয়েছে বেশি। মূল্যস্ফীতি হ্রাসেও জোর রয়েছে। তবে কর্মচ্যুতির ধারা বেগবান বলে মূল্যস্ফীতি মাঝেমধ্যে কমলেও জনদুর্ভোগ যাচ্ছে না।
শুরু থেকেই অবশ্য জনকল্যাণে নিবেদিত হতে চেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কিছু মাইলফলক কর্মসূচিও নিতে দেখা গেল তাদের। নারীর ক্ষমতায়নে জোর দেওয়ার মনোভাবটি লক্ষণীয়। কৃষকের ক্ষুদ্রঋণ মওকুফ ছিল খাদ্য নিরাপত্তায় তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি। খাল ও নদী খনন আর বৃক্ষরোপণে সরকারের আগ্রহ নজর কেড়েছিল। তবে এ সবকিছুই যেন আড়াল হয়ে যাচ্ছে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অবনতির ধারায় রয়েছে। জ্বালানি সংকটের চাপে সেটাও যেন আলোচিত হচ্ছে কম।
ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় কিছু রদবদল হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়েই নাকি সেটা ঘটবে। ক্ষমতাসীন দলেও কিছু পরিবর্তন আসছে বলে খবর। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বলেও দল ও সরকারে কিছু নড়াচড়া হবে। দল আর সরকারকে আলাদা করার চেষ্টা কি থাকবে? সবকিছুই নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের ওপর। গত ছয় মাসে তিনি নিজে কিছু পরিবর্তন এনে দেখিয়েছেন। তবে দল ও সরকার কোনোখানেই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মাঝে আলোচিত হয়েছিলেন।
বিএনপি দেড় দশকেরও বেশি সময় বিরোধী দল হিসেবে মাঠে ছিল। সুকৌশলে সংসদের বাইরে রাখা হয়েছিল এক দশক। মাঠেও স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পায়নি। এ অবস্থায় গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলেও নতুন সময়ের চাহিদা পূরণের মতো জনবল তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি বলেই অনেকের অভিমত। মন্ত্রিসভা গঠনের সময়েও কথাটা সামনে এসেছিল। ছয় মাসে আলোচনাটি হারায়নি এ জন্য যে, মন্ত্রিসভার সিংহভাগ সদস্যের পারফরম্যান্স উৎসাহব্যঞ্জক নয়। বিপুলভাবে নির্বাচিত হয়ে আসা দলের সরকারকেও তো ভালো পারফর্ম করতে হবে। নির্বাচন সব ক্ষেত্রে এর নিশ্চয়তা দেয় না বলেই সময়মতো সরকারে রদবদল এনে আস্থাটুকু অন্তত ধরে রাখতে হয়।
ছয় মাস অতিক্রম উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ না দিলেও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। তাতে প্রধানত রয়েছে দায়িত্ব গ্রহণের সময় হাতে পাওয়া পরিস্থিতির বিবরণ আর সেটা মোকাবিলায় সরকারের আন্তরিকতার কথা। জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকার কেবল আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং এর বাস্তবায়নে দক্ষতারও প্রমাণ দিতে হবে। জনপ্রশাসন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত না হলে আবার সেটা নিশ্চিত করা যায় না। এ লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় সরকারকেও কাজ করতে দিতে হবে। আমলা কিংবা দলীয় মানুষ দিয়ে সেগুলো পরিচালনার ফল কখনও ভালো হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ‘বঞ্চিত’ নেতাদের বসানোর পরিণামও ভালো হওয়ার নয়। এসব পদায়ন সংস্কারের ধারণা তো বটেই; দলীয় প্রতিশ্রুতিরও লঙ্ঘন বলে আলোচিত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যিনিই থাকুন; আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ হবে না এটা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সক্রিয় না হলে। কিন্তু গত দুবছরে তারা মনোবলটুকুও ফিরে পায়নি। মব সহিংসতার ‘দিন শেষ’ বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তারও প্রমাণ মিলছে না। এদিকে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে বলে কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টার বিষয়ে জাতিসংঘ যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটাকে ‘অনুমাননির্ভর’ বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় শাসনামলে জেএমবির উত্থানের কথা স্মরণ করেছে সংবাদমাধ্যম। দিনটি ছিল ১৭ আগস্ট। জঙ্গিদের তেমন উত্থান আর না হলেও চাঁদাবাজরা বিশেষত ‘বিজনেস হাব’গুলোয় যা ঘটাচ্ছে, সেটা দ্রুত দমন করা দরকার। র্যাবের বদলে ‘এসআরবি’ গড়তে চাইছে সরকার। তবে যেটাই করা হোক; মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই এগোতে হবে।
সরকার গত ছয় মাসে রাষ্ট্র সংস্কারে প্রত্যাশা পূরণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে, বলা যাবে না। জুলাই সনদের সঙ্গে নিজেদের ৩১ দফা সমন্বয় করেই সংস্কারে যাওয়া হবে বলে অবশ্য জানানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অংশীজনদের পরামর্শ শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়াও কাম্য। খাতওয়ারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে অগ্রগতি দেখতে চাইছে উন্নয়ন সহযোগীরা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এসব বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও গণচীনে প্রধানমন্ত্রীর ‘কৌশলগত সফর’ থেকে অবশ্য কিছু ইতিবাচক সংকেত মিলেছে, যা সামনে হয়তো পরিপক্ব হয়ে উঠবে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন