রাজনীতি
নতুন পদেও পুরাতন রিজভীকে দেখতে চাই
রুহুল কবীর রিজভী
জাহেদুল আলম হিটো
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ২১:০৬
বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ এবং লেখক স্টিফেন হকিং মাত্র ২১ বছর বয়সে ‘অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটারাল স্কলেরোসিস’ নামে মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় তিনি একটি বিশেষ স্পিচ-জেনারেটিং কম্পিউটারের সাহায্যে কথা বলতেন এবং গবেষণা চালিয়ে যান। হুইলচেয়ারে নিশ্চল বন্দি থেকে, সকল প্রতিকূলতা তুচ্ছ করেও স্রেফ অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে হয়ে তিনি উঠেছিলেন আমাদের কালের অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রুহুল কবির রিজভীও শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে রাজনীতিতে নিজের জন্য বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন। ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীর মতিহার চত্বর ‘রিজভী আহমেদ’র রক্তে রঞ্জিত হয়। ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আজিজ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই মিছিলে শহীদ হন। তৎকালীন বিডিআরের থ্রি নোট থ্রির একটি গুলি রিজভী আহমেদের তলপেট ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। মৃতুঞ্জয়ী এ নেতা সেই থেকে লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন।
বলা বাহুল্য, ছাত্র রাজনীতিতে রুহুল কবির রিজভীর উত্থান কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, ছিল কণ্টকাময়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাঁর পথচলা কতটা সপ্রতিভ ও দৃপ্ত এবং দৃঢ়– তা এ দেশের মানুষ ভালো করেই জানেন। ছাত্রজীবনে ‘রিজভী আহমেদ’ ১৯৯০ সালে রাকসু নির্বাচনে তাঁর প্যানেল থেকে একাই ভিপি নির্বাচিত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারের সবুজ চত্বর থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা হিসেবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ইতিহাসে তিনিই প্রথম কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করে দলের গণতন্ত্রায়নে অধিকতর মনোযোগী হন। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির মানসে খালেদা জিয়া ছাত্রদলের নেতৃত্ব গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে এসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে কেউ নেতৃত্ব দেবেন– তা ছিল আমাদের মতো কর্মীদের কল্পনাতীত।
২০১৬ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সদ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রুহুল কবির রিজভী দেশের গণতান্ত্রিক লড়াই ও সংগ্রামের অকুতোভয় সেনানী। মিথ্যা মামলার খড়্গ, জেল-জুলুম, রিমান্ড-নির্যাতন, মিছিলে পেটোয়া গুন্ডাবাহিনীর অতর্কিত হামলা, পুলিশের গুলি তুচ্ছ করে এগিয়ে গেছেন। গুলি খেয়ে শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করলেও লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বন্ধুর রাজনীতির পথ পাড়ি দিয়েছেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমরা জেলা শাখা ছাত্রলীগ নেতাদের শতকোটি টাকা পাচারের কথা জেনেছি। দেখেছি সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের ব্যাংক ডিরেক্টর হয়ে ব্যাংক লোপাটের কাহিনি। অথচ নিকট অতীতেও রিজভী আহমেদ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংক লোপাট তো দূরের কথা, তিনি ব্যাংকের গাড়ি নিয়ে ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজে আসার জন্য তৎকালীন অর্থ সচিবের কাছে আবেদন করেছিলেন। সচিব বিস্মিত হয়েছিলেন।
দেশের রাজনীতিতে সততা ও নৈতিকতার উদাহরণ রুহুল কবির রিজভী রাজধানীর সাধারণ এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকেছেন গোটা জীবন। ঢাকা শহরে তাঁর কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট বা প্লট নেই। মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েও তিনি প্রথমে ভাড়া বাড়িটি ছাড়তে চাননি। কর্মীদের পীড়াপীড়িতে সম্প্রতি সরকারি বাসায় উঠেছেন। নিজের কোনো গাড়িও নেই তাঁর। মন্ত্রীর পতাকা-সংবলিত সরকারি গাড়ি ছেড়ে দলীয় কর্মীদের গাড়িতে চলাফেরা করতেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য।
পার্টি অফিসে ছোট্ট যে চৌকিতে তিনি ঘুমাতেন, তার পাশের ছোট্ট টেবিলটাতে বইয়ের স্তূপ আমাদের মতো কর্মীদের বিব্রত করত। কঠিন ও দুঃসহ রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি নিয়মিত বই পড়েন, লেখালেখি করেন। মননশীল এক আড্ডাবাজ তিনি। তাঁর রসবোধের জুড়ি মেলা ভার। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর মতো নেতার অপ্রতুলতাই এ দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংকট।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শুধু নয়; ওয়ান-ইলেভেনের অসাংবিধানিক সরকার কিংবা আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ আজ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন। এই পদে থেকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নেও তিনি আগের মতো দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাবেন, আমরা আশা করতেই পারি। নতুন পদেও আমরা পুরোনো রিজভীকেই দেখতে চাই।
জাহেদুল আলম হিটো: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
- বিষয় :
- রাজনীতি
- বিএনপি মহাসচিব