ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবুজায়ন

চারাগুলো বৃক্ষ হবে কি?

চারাগুলো বৃক্ষ হবে কি?
×

আইরিন সুলতানা

আইরিন সুলতানা

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কথা না লাগিয়ে গাছ লাগালে এল নিনোর দাপট দমিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রেখে যাওয়া যায়। আমরা সারাবছর গাছ কাটি। আর বর্ষায় এখানে-ওখানে যেখানে-সেখানে গাছ লাগাই। বৃক্ষরোপণের ছবি ফেসবুকে চাউর হলে রিচ বাড়ে, রাজনৈতিক মাঠে নাম-পদবি বাড়ে, প্রকল্পের ছায়াতলে অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ে। যে চারাগাছগুলো রোপণ হলো, সেগুলো কি বাড়ে?        
২০২৫ সালের জুলাইতে চট্টগ্রাম শহরে ১০ লাখ গাছ রোপণের ঘোষণা দিল চসিক। চলতি বছর নারায়ণগঞ্জ-৩ থেকে ঘোষণা এসেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে সিদ্ধিরগঞ্জে রোপণ হবে দুই লাখ চারা। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাধারণ অঙ্কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ ৩৭ হাজার চারাগাছ রোপণ করতে হবে।     

চলতি মাসে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট-ওয়ান ট্রি’ পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির দুই হাজারের বেশি কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর প্রতি বছরে একটি গাছ লাগালে অঙ্কমতে পাঁচ বছরে দুই কোটি গাছ পাচ্ছি আমরা। সবুজায়ন ফেরাতে সরব ডিএসসিসি জানিয়েছে, নগরীর যেখানেই খালি জায়গা পাওয়া যাবে, সেখানেই গাছ লাগাতে হবে।     
পাহাড়-সমতল মিলে দেশের অন্তত ২৫-৩৩ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়। ১৯৮৫-৮৬ সালে দেশে বনভূমি ছিল ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থনৈতিক জরিপে বনাঞ্চল ছিল ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। দ্য টাস্কফোর্স রিপোর্টে ১৯৯১ সালে বনভূমি ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০১৫ সালের ভূ-উপগ্রহ চিত্র অনুসারে, বাংলাদেশে বৃক্ষাচ্ছাদিত (গ্রাম, রাস্তার ধার ও ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ, ফলের বাগান, চা-বাগানের ছায়াগাছ, সামাজিক বনায়ন) ভূমির পরিমাণ ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর বনাচ্ছাদনের (সংরক্ষিত, প্রাকৃতিক, বন বিভাগ পরিচালিত বন) পরিমাণ ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালের পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন মোট ভূমির ২৫ শতাংশ এবং বনাচ্ছাদন ১৬ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়। নতুন ২৫ কোটি চারার শতভাগ টিকে বৃক্ষ হলে পাঁচ বছর পরে ওই লক্ষ্যমাত্রার কতটুকু অর্জন হবে?      
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ নামে আটজনের একটি সেল করা হয়, যার নীতি হলো ‘রাইট ট্রি, রাইট প্লেস’। চালু হবে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ। জাতীয় ড্যাশবোর্ডে গাছের মরা-বাঁচার রিয়েল-টাইম তথ্য থাকবে। এই সেল গাছ ও চারা নির্বাচন-সংগ্রহ করবে। বৃক্ষরোপণের জায়গা বাছাই করবে। বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের সমন্বয় করবে। ক্যাম্পেইন করবে। পুরো কর্মসূচির অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। এর মধ্যে বৃক্ষরোপণের মহোৎসব শুরু হলেও এখনও সেল থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা, কর্মপরিকল্পনা এবং বৃক্ষরোপণ পঞ্জিকা ঘোষণা হয়নি। ফলে বৃক্ষাচ্ছাদন ও বনাচ্ছাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতখানি মিটবে সে প্রশ্ন তোলাই যায়।     

সবুজায়নের ওয়াদা পূরণে বৃক্ষরোপণ সেলের সঙ্গে উপজেলা, জেলা, বিভাগ, সিটি করপোরেশনের নিয়মিত সভা হতে হবে। বৃক্ষরোপণ সেলে অবশ্যই বৃক্ষবিশারদ, নিসর্গবিদ, পাখিবিশারদ, নদী গবেষক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, বন্যা বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং রাজউক প্রতিনিধি থাকবেন। সবুজায়ন এবং শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে এই সেলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও মনোবিদ সম্পৃক্ত রাখতে হবে। জেলা-উপজেলার মাটি, নদী, বৃষ্টিপাত, শীত-গ্রীষ্ম এবং স্থানীয় গাছপালার ঐতিহ্য মেনে বৃক্ষ ডেটাবেজ থাকবে সেলের কাছে। 

বৃক্ষরোপণ সেলের দায়িত্ব অনেক। তাদের বৃক্ষ ডেটাবেজে শহর ও গ্রামের হারিয়ে যাওয়া ও বিপন্ন গাছপালার জন্য বিশেষ চিহ্ন থাকবে। ডেটাবেজে গাছপালার বৈশিষ্ট্য অনুসারে ফলদ, বনজ, ভেষজ শ্রেণি থাকবে। অঞ্চল ও এলাকায় সেভাবেই চারা বিতরণ-রোপণ হবে। বন্যায় টিকে থাকতে ও নদীভাঙন রোধে সক্ষম গভীর শিকড়ের গাছের বিশেষ তালিকা রাখতে হবে। এসব গাছ নদীর আশপাশে লাগাতে হবে। পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে চলতি পথে বিভিন্ন মৌসুমে ছায়া ও শোভা বাড়াতে ফুলেল সড়ক গড়ে তুলতে হবে। সৌন্দর্যবর্ধক গাছ এবং সড়কের সুনির্দিষ্ট নির্বাচন করতে হবে। 
কোন এলাকা ও অঞ্চলে কত সংখ্যক ও কী ধরনের চারা রোপণ হবে, কবে এবং কারা এসব চারা রোপণ করবে–সেল থেকে এসব তথ্য প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হবে। রুটিন মেনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন করবেন। কোন সংস্থা এসব চারার নিয়মিত যত্ন করবে, তাও জানাতে হবে রিপোর্টে। বৃক্ষরোপণে ব্যক্তি অনুদানের সুযোগও থাকতে পারে। কোনো ব্যক্তি চারাগাছ বা সমপরিমাণ অর্থ মূল সেলে জমা দিতে পারেন। সেল ওই অর্থ বা গাছ বণ্টন করবে উপযুক্ত টিমে। কর্মসূচির জন্য কোন কোন ক্ষুদ্র-বড় নার্সারি থেকে চারা কেনা হবে তা তালিকাকারে প্রকাশ করতে হবে। এতে কতসংখ্যক নার্সারি উদ্যোক্তা লাভবান হচ্ছেন এবং চারা ক্রয়ে মোট কত ব্যয় হচ্ছে, এটি নিয়ে স্বচ্ছতা থাকবে। বজ্রপাত ঝুঁকিপ্রবণ এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং গোটা দেশেই তালগাছের পরিমাণ জরিপ করতে হবে। তালগাছ রোপণে বিশেষ টিম করতে হবে; যারা তালের চারা তৈরির প্রস্তুতি থেকে চারা রোপণ ও যত্ন নেওয়ার কাজ করবে। তালগাছ কতসংখ্যক বাড়ানো গেল, তাতে বজ্রপাতে ক্ষতির ঝুঁকি কতটা কমানো গেল, এ বিষয়েও পরের ধাপে জরিপ জরুরি।

দেশের অন্তত ২৯ জেলাতে নাকি কোনো রাষ্ট্রীয় বনভূমি নেই। এই জেলাগুলোতে গুরুত্ব দিয়ে সবুজায়নের উদ্যোগ নিতে হবে, যেন পাঁচ বছর পরে রাষ্ট্রীয় বনভূমিহীন জেলার সংখ্যা শূন্য হয়। গ্রামে ও নদীবর্তী এলাকায় চারাগাছের যত্নে নারী স্বেচ্ছাসেবক টিম করে দিলে আশাব্যঞ্জক ফল পাবে বৃক্ষরোপণ সেল। শুধু বর্ষা নয়, বছরজুড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও যত্ন অব্যাহত রাখতে হবে। ট্রি ড্যাশবোর্ড নাগরিকদের জন্য দ্রুত উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। সেল থেকে প্রতিদিন ট্রি বুলেটিন প্রকাশ করা হোক মিডিয়া কভারেজের জন্য। মেঘবৃষ্টিতে এর মধ্যে অনেক চারা রোপণ হয়ে গেছে দেশজুড়ে। একটি সবুজ ড্যাশবোর্ডে বেড়ে ওঠা বৃক্ষের তথ্য দেখতে চাই অচিরেই।

আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল      
 

আরও পড়ুন

×