ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

বিরোধী জোটের ক্রমপ্রকাশমান রাজনীতি

বিরোধী জোটের ক্রমপ্রকাশমান রাজনীতি
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার ছয় মাসে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় বিরোধী জোট। রোববার সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘ব্যর্থতার জন্য সরকারকে জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিরোধী দলসহ জনগণের কাছে সহায়তা কামনা করা উচিত ছিল।’ বিরোধী জোট ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দাবিতে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ কর্মসূচি’ ঘোষণাও করে। বিভাগভিত্তিক লং মার্চ কর্মসূচির পর রাজধানীতে মহাসমাবেশের তারিখ ঘোষণার কথাও বলা হয়।

সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী জোট গত ছয় মাসে কার্যত ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা’ বাস্তবায়নকেই তাদের প্রধান দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মনে হতে পারে, ১১ দলীয় জোটই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র অংশীজন। শুধু তাই নয়; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বাম প্রগতিশীল গোষ্ঠী তো বটেই, খোদ বিএনপিকেও ‘জুলাই চেতনাবিরোধী’ চিহ্নিত করার অপচেষ্টায় রত। 

নির্বাচনের পর থেকেই ১১ দলের দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যুক্তি– বিএনপিসহ ‘সব রাজনৈতিক দল’ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার টানা ৯ মাস যে সংলাপ করে, সেখানে ৩০টি রাজনৈতিক দল ছিল ৫৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে। যে ৪টি প্রশ্নে গণভোট হয়েছিল, সেগুলোও অন্তর্বর্তী সরকার নিজে ঠিক করে নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল! 
সংলাপে ১১টি পয়েন্টে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্ন ফেঁদে বসে– একটি উচ্চকক্ষ তৈরি হবে ভোটের আনুপাতিক হারে! গ্রহণযোগ্য চারটি নির্বাচনে- ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে ৪০ শতাংশ করে ভোট পেয়েছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ।

এর মধ্যে নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ছিল অনুপস্থিত; বিএনপি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, তারা প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ তৈরিতে রাজি। তারপরও জামায়াত-এনসিপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ তৈরির চিন্তা কেন করেছিল অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার? কারণ তারা জানত, বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট বিএনপির বিরুদ্ধে ইতিহাসে শতকরা ৩ থেকে ৬ শতাংশ ভোট পাওয়া জামায়াত ও সদ্যপ্রসূত এনসিপির পক্ষে ক্ষমতায় আসীন হওয়া অসম্ভব। তাই উচ্চকক্ষে নিজেদের উত্তরাধিকার ধরে রাখবার জন্যই আনুপাতিক হার চাপিয়ে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার? চাপিয়ে দেওয়া এই গণভোটের রায় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়ী বিএনপিকে মেনে নিতে হবে!

২.
জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী জোট জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বলতে কী বোঝে– এটিও এখন বহুমূল্য প্রশ্ন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান রোববার বলেছেন, চব্বিশের আন্দোলন ছিল চূড়ান্ত যুদ্ধের মহড়া। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘জুলাই জাদুঘরেও দলীয়করণ করেছে সরকার। ১৯৪৬ বা ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে অনেক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে যারা পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাদের তুলে ধরা হয়েছিল। এর অনেককিছু গায়েব করে ফেলা হয়েছে’ (যুগান্তর, ২৪ আগস্ট ২০২৬)।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই আমরা ইতিহাসের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা লক্ষ্য করছি। স্বাধীন বাংলাদেশে কোন বিবেচনায় পাকিস্তানের জাতির পিতার জন্মদিন সাড়ম্বরে পালন হতে পারে– এর ব্যাখ্যা যেমন মেলে না; তেমনই স্বদেশের অত্যাচারী সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সমান্তরালে স্থাপন করার উদ্দেশ্যও গোপন থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, কটূক্তি, ইতিহাস নিয়ে কুতর্ক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিবিরোধী যাবতীয় পরিকল্পনা ও প্রয়াস সবই একসূত্রে গাঁথা। লাহোর প্রস্তাব, ভাষা আন্দোলন, ষাট দশকে বাঙালির পাকিস্তানবিরোধী রেনেসাঁ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ভূমিকা, ২৫ মার্চের কালরাত ও পরবর্তী ৯ মাসে জাতির অমিত সংগ্রাম ও স্বাধীনতাবিরোধীদের কলংকিত অধ্যায় স্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেওয়ার বহু চেষ্টা আমরা গত দুই বছরে লক্ষ্য করেছি। 

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছিলেন, জুলাই জাদুঘরের একটি অংশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের ঘটনাবলি তুলে ধরা হবে। গত ৫৪ বছরে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নানা অনিয়ম, অবিচারের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে শুধু ১৯৭২-৭৫ সময়কাল সম্পর্কে নিজেদের ব্যাখ্যা সরকারি জাদুঘরে টানিয়ে দিতে চায় কোন গোষ্ঠী? মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে অন্তর্জ্বালার সঙ্গে এই অপচেষ্টা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শহীদ জিয়ার সময়কালে মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খণ্ড দলিল অথবা তাঁর কোনো ভাষণ কিংবা পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে তাঁর কোনো ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধা করে কোনো উক্তি আমরা শুনিনি। তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধু নিয়ে কুৎসা ও বিতর্ক কারা করছে? কেন করছে? বুঝতে কষ্ট হয় না।

৩.
বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের শক্তিই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূল ভীতি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চার স্তম্ভ– গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। তাই তারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিতে চায়! কারণ ওই সংবিধানেই যুক্ত ‘সেক্যুলারিজম’ বা ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সব ধর্ম ও মতের মানুষকে সমান মর্যাদা ও সম্মান প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বা পরে বিএনপি সংবিধান সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধী জোটের মাৎস্যন্যায়ে রাজি ছিল না। এখনও নেই। এ কারণেই তারা সংবিধান সংশোধনী কমিটি তৈরি করে সংসদে বাহাত্তরের মূল সংবিধান অক্ষুণ্ন রেখে তাকে সময়োপযোগী ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতি রেখে সংশোধনের প্রস্তুতি নিয়েছে। 

দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়েও রক্ষণশীলদের আপত্তি চোখে পড়বার মতো। বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি নারী সংস্কার কমিশনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক শক্তির অশালীন আক্রমণের কোনো প্রতিবাদ বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে হয়নি। বরং জোটের নেতৃবৃন্দ নারীবিরোধী সেই সমাবেশে অংশ নেন। এ অবস্থায় বিএনপিকে নিজেদের উদার মধ্যপন্থি রাজনৈতিক অবস্থানে মুক্তিযুদ্ধের প্রাসংগিকতা ও বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। যেমনটি নির্বাচনের আগে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের পরিচয় হিসেবে হাজির করেছিল। 

মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ– গণতান্ত্রিক বিবেচনা, সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতা, অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের অমলিন আহ্বান চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত পরিপূরক। একে ধারণ করে এগিয়ে গেলে ডানপন্থি রাজনীতি এ দেশে কখনোই একদেশদর্শী সমাজ তৈরিতে সক্ষম হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের কথা সাম্প্রদায়িক শক্তি যতভাবেই বলুক না কেন; এর প্রকৃত প্রত্যয় অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক– এই সত্য যত দ্রুত বিএনপি সামনে নিয়ে আসবে, দেশের মঙ্গলও তত দ্রুত হবে।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×