সমাজ
নারীরা এগোলো, না পেছালো?
মোছা. নূরজাহান খাতুন
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কভিডকালে বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির ধারা এখনও অব্যাহত। ঘরের বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রাও কমেনি। নারী শিক্ষার হার, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবস্থান প্রভৃতি সূচকেও উন্নতি নেই। অথচ নারীর উন্নয়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপূরক। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেককে পিছিয়ে রেখে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করলে বরং জাতীয় উৎপাদন বাড়ে; সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। স্বীকার্য, বিভিন্ন স্তরে নারী শিক্ষার্থীর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিকে প্রায় ৬২ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৫৫ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে প্রায় ৫২ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৬ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ হয়েছে। তবে নীতিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও আইনি সুরক্ষা ও সহিংসতা রোধে দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক অন্তরায় এখনও বিদ্যমান।
পারিবারিকভাবেও নারী কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে, সেটা বোঝা যায় কিছু পরিসংখ্যানে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএ পরিচালিত সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৭৬ শতাংশ বা প্রতি চারজন নারীর তিনজন তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময় অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নারী গত এক বছরে এই নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় ৫৪ শতাংশ নারী স্বামী বা জীবনসঙ্গীর মাধ্যমে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সহিংসতার শিকার প্রায় ৬২ শতাংশ নারী লজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে বিষয়টি কাউকে জানান না বা আইনি সহায়তার পথে যান না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক পাঁচ বছরের বিভিন্ন সময়ে ১২ হাজারের বেশি নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার, যার মধ্যে রয়েছে ছয় হাজারের অধিক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা।
দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষায় নারীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও পুরুষ গ্র্যাজুয়েটের তুলনায় নারী গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারের হার বেশি। নারীর বড় একটি অংশের কর্মসংস্থান এখনও অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা বা সুযোগ-সুবিধা নেই। কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব, যাতায়াতে নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থানে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন কারখানায় আধুনিক ও ভারী যন্ত্রপাতি চালাতে পুরুষ শ্রমিকদের বেশি দক্ষ মনে করা হয়। ফলে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক সনাতন কাজ কমে যাওয়ায় নারীর নিয়োগ কমছে। নারীদের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতারও ঘাটতি রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয় কী? দেশের যে কোনো সংকটকাল যেমন– বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্রাদুর্ভাব, মহামারি, যুদ্ধ, মন্দাকাল ইত্যাদি যে কোনো প্রতিকূল সময়ে নারীরাই বেশি প্রভাবিত ও ভুক্তভোগী। আবার বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে এখনও নারীরা পিছিয়ে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানে, সেখানে প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে নারীকে সমান ধাপে এগিয়ে নিতে একটু নজর দিতেই হবে নারীর দিকে সরকারকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন জরুরি।
আমরা দেখছি, কর্মক্ষম নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশে উন্নীত। এই হার ক্রমাগত বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আত্মকর্মসংস্থান ও দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নারীকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ও নারী স্বাক্ষরতা ধারাবাহিকভাবে উন্নত হয়েছে। তবে নীতিনির্ধারণী এবং নির্বাহী ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
গার্হস্থ্য নির্যাতন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে যে আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে, সেটা জাতীয়ভাবে লজ্জাজনক। নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নারীর অধিকার সুরক্ষার আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ ও আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এখনও বড় বাধা, যা দূর করতে হবে।
নারী শিক্ষার হার বাড়লে শিশুমৃত্যুর হার, পুষ্টিহীনতা এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। তাই নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নারীদের দক্ষ করতে এখনই পদক্ষেপ না নিলে নারীদের শুধু পোশাকশিল্পে নয়, অন্য অনেক জায়গায়ই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
মোছা. নূরজাহান খাতুন: অবসরপ্রাপ্ত
অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- সমাজ