সমকালীন প্রসঙ্গ
জ্বালানি থেকে সার সংকট: উত্তরণ কীভাবে
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
তথ্য উপদেষ্টার কথাটি ভুল নয়– অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইরান যুদ্ধ হলে তারাও বড় জ্বালানি সংকটে পড়তেন। তাদের সময়ে কোনো এলএনজি টার্মিনালও দুর্ঘটনায় পড়ে দীর্ঘদিন অকেজো থাকেনি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল, গ্যাস বা সার পাওয়া নিয়ে গুরুতর সংকটেও পড়তে হয়নি তাদের।
বিএনপি সরকারের সঙ্গে জনগণেরও কপাল মন্দ। একের পর এক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। জ্বালানি তেল নিয়ে সংকট কমে আসতে না আসতেই তীব্র হয়ে উঠল গ্যাস সংকট। এর প্রত্যক্ষ কারণ সবার জানা। অন্তর্বর্তী সরকার কেন অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে দুটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার চুক্তিই বাতিল করে দিয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ নিল না– এই সংকটে সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল চালুর পর আবার জানা যাচ্ছে এলএনজিবাহী কার্গো আসা নিয়ে ‘জটিলতা’।
কীভাবে আমরা এলএনজিনির্ভর হলাম; কীভাবে এটা আমদানি হয়; ভোক্তার কাছে পৌঁছে– এসব এখন অনেকেরই জানা। হরমুজের পাশাপাশি বাব আল মান্দেব কেন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এখন আলোচিত। আমদানীকৃত সার পরিবহনেও এসব প্রণালির গুরুত্ব ব্যাপক। আমরা এখন সার সংকটও মোকাবিলা করছি; দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনের আমন মৌসুম চলাকালে।
সরকার বলছে, সারের মজুতে সংকট নেই। আমদানি প্রক্রিয়াও চলমান। সর্বাধিক ব্যবহৃত ইউরিয়া সারেরও বড় অংশ আমরা আমদানি করি। পরিকল্পনা ছিল ইউরিয়াটা দেশেই উৎপাদন করার। এতে খরচ পড়বে কম। বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতাও আমাদের পাবে না। হালে আমরা দেখলাম, ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সারের সরবরাহও বিঘ্নিত হলো। সরকারকে এখন বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এ খাতেও ভর্তুকি বাড়ছে, বিশেষত অর্থ সংকটকালে।
তারপরও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সার নিয়ে কৃষকের সংকটের কথা জানা যাচ্ছে। ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার খবরে অবশ্য ঘুম ভেঙেছে সংশ্লিষ্টদের। বিশেষজ্ঞরাও মত দিচ্ছেন। মজুত আর আমদানিতে সংকট না থাকলেও বিতরণ ব্যবস্থায় সংকট তো থাকতেই পারে। সরকার হালে সার বিতরণ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছিল, যেটা তৈরি করেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকার বদলের সুবাদে নতুন কোনো গোষ্ঠী সার বিতরণে ঢুকতে চাওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে কিনা, সেটিও জরুরিভাবে দেখা দরকার। আমন মৌসুমের পর বোরোতে সারের চাহিদা আরও বাড়বে, মনে রাখা চাই।
কৃষির আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্যায়ণের সঙ্গে সারের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না বলে ক্রমে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। বিদ্যুতের মতো এ ক্ষেত্রেও আমরা স্থাপিত সক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। গ্যাস সংকটে অধিকাংশ সার কারখানা এখন বন্ধ। সারা বছরই কমবেশি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে অধিক উৎপাদনক্ষম একটি সার কারখানায় গ্যাস জোগানোয় ওই অঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক বস্ত্র খাত বসে পড়ার খবর আবার ছড়িয়েছে উদ্বেগ। গ্যাসের ঘাটতিতে কমবেশি সারাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পেই সংকট তীব্র। বাড়ছে রপ্তানি আদেশ হারানো ও কর্মসংস্থান কমার ঝুঁকি।
জ্বালানি সংকট কীভাবে একটার সঙ্গে আরেকটাকে জড়িয়ে গোটা অর্থনীতিকে স্থবির করে দেয়, সেটি কাউকে আর বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে না। মানুষ প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝে নিচ্ছে। রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বসে নিবন্ধটি লেখার সময় নিজেও মোকাবিলা করেছি লোডশেডিং। গ্রাম থেকে এটি শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার একটা ভালো দিক অবশ্য– কথিত নাগরিক সমাজের ত্বকে সংকটের হলকা এসে লাগা। তবে সবখানে জ্বালানির সরবরাহ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ নয় সব খাতে। কর্মসংস্থান ও বিদেশি মুদ্রা আয়ের স্বার্থে রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ জোগাতেই হবে। সেই চেষ্টায় সরকার এখন চাইছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কম গ্যাস দিয়ে শিল্পে বেশি জোগাতে। বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে না পারাও স্পর্শকাতর বিষয়।

এ ধরনের সংকটে সরকার বলতেই পারে, আগেকার সরকারগুলো জ্বালানি খাতকে নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। এটাও বলতে পারে, ইরান যুদ্ধের অভিঘাত এসে না পড়লে বিদ্যমান সক্ষমতায়ও পরিস্থিতি সামলে চলা যেত। তবে মানুষ এসব ব্যাখ্যা বেশি দিন শুনতে চাইবে না। তারা বলবে, যে করে হোক পরিস্থিতি অন্তত সহনীয় করুন। গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তো বোঝা গেল, কৃষক কতটা ক্ষুব্ধ। অতিরিক্ত দামেও সার বিক্রি হওয়ার কথা নয়। সেটিও নাকি হচ্ছে। এর মধ্যে এলপিজির প্রাপ্যতা আর দাম নিয়ে সংকটের কথা অবশ্য তেমন শোনা যাচ্ছে না। পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এই গ্যাসের ব্যবহারও গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। গাড়িতেও বাড়ছে এলপিজির ব্যবহার। সিএনজি সংকটে এটা আরও বাড়বে বলে ধারণা। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানও বিপদে পড়ে এলপিজি ব্যবহার করছে বলে খবরে প্রকাশ।
সংকটে পড়ে আমরা এলএনজিনির্ভর হয়েছিলাম, তাতে দোষের কিছু নেই। ইউরোপের দেশগুলোও এলএনজির আমদানি বাড়িয়েছে। মুশকিলটা ওখানে যে, ইত্যবসরে আমরা গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিইনি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির পরও সতর্ক হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। তারা বরং আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠায় গিয়ে আমদানিনির্ভর কাঠামোটাই অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। ইরান যুদ্ধে বোঝা গেল, কাঠামোটা কত অনির্ভরযোগ্য! গ্যাস পেলেও টার্মিনাল অচল হয়ে পড়তে পারে; আবার টার্মিনাল সচল থাকলেও গ্যাস নাও মিলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি মিলছে কমই। কারণ যুদ্ধে উপসাগরীয় সেই উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত। এলএনজি কিনতে হচ্ছে খোলাবাজার থেকে, ক্রমবর্ধমান দামে। সাশ্রয়ী দামে এলএনজি পেতে গিয়ে সরবরাহ সংকটে পড়ার খবরও মিলল। দামের দিকে না তাকিয়েই এখন যা করার করতে হবে। এদিকে নতুন চার্জের কারণে আদানির বিদ্যুতের খরচ বাড়তে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনার চাপেও ওখান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি যেন ব্যাহত না হয়। মাঝে মিয়ানমার থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল। এতে অগ্রগতি হতে সময় লাগবে। ইত্যবসরে ভোলায় পাওয়া গ্যাস পরিমাণে কম হলেও তা ব্যবহারোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সংকটকালে যেখানে যেটুকু সম্ভাবনা, তা কাজে লাগানো জরুরি হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত গাড়িতে সিএনজির ব্যবহার বন্ধ করা গেলেও কিছু বাড়তি গ্যাস হয়তো শিল্পে দেওয়া যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশে প্রাপ্ত কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর চিন্তা থেকে ‘উন্মুক্ত পদ্ধতি’তে এর উত্তোলনে যাওয়ার কথা বলে অবশ্য সমালোচনায় পড়েছেন অর্থমন্ত্রী। আপাতত আমদানি করেই কয়লার চাহিদা মেটাতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে ফার্নেস অয়েল আর ডিজেলের ব্যবহারও বাড়াতে হতে পারে। এ সব উপকরণই সংগ্রহ করতে হচ্ছে অস্বাভাবিক বেশি দামে। তাতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল ডলারের দামও বাড়তে পারে। নাও পারে। কারণ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখন কম। এর পণ্যসামগ্রী আমদানির চাপ সহসা বাড়বে বলে মনে হয় না। এরও প্রধানতম কারণ চলমান জ্বালানি সংকট।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন