ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

নেপালের বিপর্যয়ের বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা

নেপালের বিপর্যয়ের বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা
×

নাসরিন মালিক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ুর এই বিপর্যয় ঘটছে একটিমাত্র পৃথিবীতেই, কিন্তু বাস্তবচিত্র যেন সম্পূর্ণ আলাদা– দুটি জগতের। এক জগতে এর প্রভাব প্রতিদিনের জীবনে ধীরে ধীরে থাবা বসাচ্ছে, যেখানে অস্বস্তির সময়টা বেশ লম্বা আর তীব্র কষ্টের সময়টুকু কিছুটা সংক্ষিপ্ত। সেখানে শেষ হতে না চাওয়া তীব্র তাপদাহের গ্রীষ্ম, আর তারই মাঝে হঠাৎ দাবানল, ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো কিংবা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘরবাড়ি ছাই হয়ে যাওয়া। অন্য জগতে যা ঘটছে, তা স্রেফ কেয়ামত। এই গ্রীষ্মের অভিজ্ঞতা সেই বৈষম্যের চিত্রকেই তুলে ধরেছে। ইউরোপের কিছু স্থানে গড়ে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে উষ্ণ দিন; অন্যদিকে নেপালে পানি, কাদা ও বরফের এমন স্রোত যা এ পর্যন্ত ৭৫০ জনের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এখনও নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ।

পার্থক্যটা সম্পদের জায়গাতেও। জলবায়ু সংকটের একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিও রয়েছে, তবে কিছু দেশ অন্য দেশের চেয়ে এই ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্য বেশি রাখে। এই গ্রীষ্মে ইউরোপের দাবানল মোকাবিলায় যেমন ফরাসি সরকারকে দ্রুত নানা পদক্ষেপে নামতে দেখা গেছে– যার মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসার জন্য করছাড় দেওয়া থেকে শুরু করে পুনর্বাসন খরচ ও নতুন ঘর বাঁধার সহায়তা। অন্যদিকে, গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাজ্যের সরকার দাবানল সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করেছিল। 

নেপালে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যা দরকার, তা তাদের পুরো অর্থনীতির প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ বা ৫০০ কোটি ডলারের মতো। এই হিসাবের মধ্যে প্রয়োজনীয় কারিগরি বৈদেশিক সহায়তা, সরঞ্জাম, দক্ষতা কিংবা শ্রমশক্তির হিসাব তো ধরাই হয়নি। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সর্বগ্রাসী ধ্বংসের মাত্রাগত ঝুঁকির ব্যবধানও আকাশ-পাতাল।
প্রবালপ্রাচীর বা কোরাল রিফের কথাই ধরা যাক, যা ধ্বংস হলে উপকূলীয় মানুষের জীবন কতটা চরম বিপদে পড়ে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর পানি অতিরিক্ত এসিডযুক্ত হওয়ার কারণে ক্যারিবীয় অঞ্চলজুড়ে কোরাল ব্লিচিং বা প্রবালের মরে সাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এটি কেবল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করছে না, যা পুরো এলাকার খাদ্য ও আয়ের প্রধান উৎস। বরং ঝোড়ো হাওয়ার তীব্রতা ও মাত্রা করছে বহু গুণ। যেমন জ্যামাইকার মোট অর্থনীতির ৯০ শতাংশই আসে তাদের উপকূলীয় এলাকা থেকে। 

কারণ প্রবালপ্রাচীর প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করে। এটি সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি কমিয়ে উপকূলীয় এলাকা বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক; এ দুই সংকটের যৌথ চাপে ক্যারিবীয় দেশগুলো একচ্ছত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের (সমুদ্রের পানি গরম হওয়ায় হারিকেনের শক্তিও বাড়ছে) শিকার হচ্ছে। ফলে তাদের আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যেরও ক্ষয় হচ্ছে।
এরপর রয়েছে তীব্র তাপদাহ। তাপমাত্রা কেবল ইউরোপেই গড় সীমার চেয়ে অনেক ওপরে উঠছে না। বরং যেসব এলাকায় এমনিতে গরম বেশি সেখানেও রেকর্ড ভাঙছে। গত সপ্তাহে ‘হার্পারস ইনডেক্স’-এ ভারতের আনুমানিক গরমজনিত মৃত্যুর একটি খতিয়ান তুলে ধরা হয়, যার তথ্য অত্যন্ত আঁতকে ওঠার মতো। কেবল এক দিনের তীব্র তাপদাহে ৩ হাজার ৪০০ এবং টানা পাঁচ দিনের তাপদাহে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত ৫০টি শহরের সবই ছিল একটিমাত্র দেশে; ভারতে। সবচেয়ে বড় বোকামি আর সংকীর্ণতা হলো, অভিজ্ঞতার এত বড় ব্যবধান থাকায় আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে হিমবাহ গলে যাওয়া, বন্যা কিংবা দুর্ভিক্ষ তো অনেক দূরের কোথাও ঘটছে। কিন্তু এর পরোক্ষ প্রভাব– খাদ্য সরবরাহের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর শরণার্থী সমস্যা শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার ওপর পড়বে। 

হটস্পটগুলোর পরিস্থিতি হয়তো আশঙ্কাজনকভাবে আরও খারাপ হবে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটা থেকে আমাদের কারোই পালিয়ে বাঁচার উপায় নেই। অথচ ঠিক যে মুহূর্তে এই উপলব্ধির কারণে জীবনযাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সবার এক হয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। দিনশেষে আমরা সবাই একই গ্রহে আটকা পড়ে আছি।

নাসরিন মালিক: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×