ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

‘দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা’ মোকাবিলার রাজনৈতিক উপায়

‘দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা’ মোকাবিলার রাজনৈতিক উপায়
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেলে বেশ হট্টগোল হয়। ‘পূর্ণাঙ্গ সংস্কার’কে পাশ কাটিয়ে সরকার ‘খণ্ডিত সংস্কার’ করতে চায়– রাতে এই অভিযোগে বিরোধী দল ওয়াক আউট করে; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলসহ তিনটি বিল উত্থাপনের আগে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জানান, তারা গণভোটের বাস্তবায়ন চান ও খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, বিরোধী দলের উদ্দেশ্য ছিল আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা না করা। গুম ও মানবাধিকার কমিশন গঠন সংক্রান্ত বিল দুটি সংসদীয় কমিটিতে গেলে সেখানে আলোচনা হবে বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই ‘দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা’ হিসেবে জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন (প্রথম আলো, ২৮ আগস্ট ২০২৬)।

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা ওই আদেশে জানানো হয়েছিল, পরবর্তী অর্থাৎ চলতি সংসদ আইনসভা এবং সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল– উভয় কার্যক্রমের এখতিয়ার পাবে। সেই সংসদে দাঁড়িয়েই বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সনদটিকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা’ আখ্যা দিলেন। এর আগেও তিনি বলেছিলেন, গণভোট আয়োজনের পক্ষে বিএনপি সায় দিয়েছিল; নইলে হয়তো নির্বাচনই করতে চাইত না অন্তর্বর্তী সরকার!

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের এসব স্বেচ্ছাচার কেবলই কাকতালীয় ছিল না। মাত্র ২৫টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাকেই ‘জাতীয় ঐকমত্য’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও ছিল। এমনকি সেই সরকারের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। গণভোটে যে চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, সেগুলোও ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মনগড়া। এর কোনো কোনোটি প্রসঙ্গে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল আগেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ জানিয়ে রেখেছিল। আবার অন্তর্বর্তী সরকার নিজে গণভোট আয়োজন করে নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় নেমে পড়েছিল!

সত্য, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছিল। তবে অনির্বাচিত সরকার গণভোটে নিজেদের পছন্দমতো চার প্রশ্নে গণরায় নিয়ে সেইমতো সংবিধান সংস্কারের পথ তৈরি করবে– এই দাবি অভ্যুত্থানের আগে-পরে কোনো অংশীজনের পক্ষ থেকেই জানানো হয়নি।

২.
গণভোটের চারটি প্রশ্নের দ্বিতীয়টি ছিল– ‘আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।’ অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী দলও নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। বরং আনুপাতিক হারে বিরোধী দল উচ্চকক্ষে আসন বরাদ্দ নিয়ে সংবিধান সংশোধনসহ সব কার্যক্রম চূড়ান্ত করবার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখবে।

দেশের আইনসভা এককক্ষ না দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে– এমন মৌলিক কাঠামোগত সিদ্ধান্ত কোনো অনির্বাচিত সরকারই নিতে পারে না। কিন্তু অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার অতিউৎসাহী হয়ে এমন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ গণভোটের মাধ্যমে আইনে পরিণত করবার উদ্যোগ নিয়েছিল। দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণার এর চেয়ে প্রকৃষ্ট নিদর্শন আর কী হতে পারে? অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশিত জুলাই সনদের ভূমিকায় বাংলাদেশের যে ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাও দুরভিসন্ধিমূলক– ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগণের ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করলে পরদিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে’।

হানাদার বাহিনী? কে বা কারা– জানে না অন্তর্বর্তী সরকার? ইতিহাসের ইচ্ছাকৃত বিকৃতি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে অহরহ লক্ষ্য করা গেছে। সেই ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব উল্লেখ না করবার মধ্য দিয়েও পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাঙালি রেনেসাঁকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

আবার, গণভোটের ৪ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে– ‘জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’ অন্যান্য সংস্কার? তার মানে, কিছু সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছামতো হওয়ার পর বাকিগুলো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি অনুসারে হবে। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের গুপ্ত বাসনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এ দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো কেন নেবে? 

৩.
জুলাই সনদের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডার দেখা মেলে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ২৩ বছরের সুদীর্ঘ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামের এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধোত্তর সংবিধানের প্রধান চার স্তম্ভ– গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। জুলাই সনদে এগুলো বাদ দিয়ে পছন্দমতো নতুন স্তম্ভ চাপিয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কয়েকজন অনির্বাচিত ব্যক্তি ‘জাতীয়’ সংলাপের নামে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাতির জন্মসূত্র মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বদলে দেবার আকাঙ্ক্ষা করে? এটি যদি অভিসন্ধিমূলক প্রতারণা না হয়, তবে আর কোনটি?

তাই গণভোট কিংবা জুলাই সনদ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির লাগাতার দাবিদাওয়ার বিপরীতে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী বিএনপিকে সুস্পষ্ট বক্তব্য হাজির করতে হবে। উগ্রবাদী রাজনীতির সম্ভাব্য পরিণতি জানাতে হবে জাতিকে। যুগের পর যুগ যে অসাম্প্রদায়িক, সহিষ্ণু সমাজ এই দেশের মানুষ চর্চা ও আকাঙ্ক্ষা করে এসেছে, তা সমূলে নষ্ট হবার আগেই দৃঢ় প্রতিরোধে দেশের মানুষকে একতাবদ্ধ করতে হবে। 
অবশ্য বিরোধী দলকে মোকাবিলা করতে হলে সরকারি দলকে সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নেও জোরালো অবস্থান নিতে হবে। গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে নানাভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারও যে সফল হবে– শুরুর ছয় মাসে সেই লক্ষণ স্পষ্ট নয়। এর মধ্যেই অবশ্য বিরোধী দল লংমার্চসহ মহাসমাবেশের আয়োজন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে দমন-পীড়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। 

আওয়ামী লীগ সরকার গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত– এই নিয়ে সংগত কারণেই নানামাত্রিক আলোচনা চলছে। জামায়াত, এনসিপিও এ বিষয়ে সরব। এদিকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২৪ মাস আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী বিনাবিচারে জেলে আটক রয়েছেন। উপযুক্ত অভিযোগ নেই; তবুও জামিন পাচ্ছেন না তারা। সরকারের উচিত হবে বিনাবিচারে আটক সবাইকে অনতিবিলম্বে জামিন দেওয়া। তাদের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে দায়েরকৃত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে নিজের গতিতে চলতে দেওয়া। 

অন্তর্বর্তী সরকার দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা করেছিল– এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কোনো কোনো মহল এখনও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। কিন্তু সুশাসন ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারলেই সরকারের পক্ষে যাবতীয় দুরভিসন্ধিমূলক প্রতারণা মোকাবিলা করা সহজসাধ্য হবে। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×