আন্তর্জাতিক
ইরানে নতুন নিষেধাজ্ঞা যে কারণে ব্যর্থ হতে পারে
জেফ্রি ডি স্যাক্স ও সিবিল ফারেস
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত সপ্তাহে পাকিস্তান ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা মানবে না এবং প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে। চীন একই ধরনের বক্তব্য দেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর এ খবর এলো। ২৪ আগস্ট অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্টের অধীনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন, সেটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ বলা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ‘বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ তৈরি করা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে একে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেন। ইরানকে ‘যে কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা’ দেওয়া যে কোনো দেশের জন্য ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ডেকে আনবে বলে তিনি হুমকি দেন। ছয় মাস ধরে মার্কিন বোমা বর্ষণ এবং নৌ অবরোধ কোনো জয় এনে দিতে না পারায় বর্তমান পরিকল্পনা হলো ইরানকে অনাহারে রেখে আত্মসমর্পণ করানো। এই নতুন পদ্ধতিটি অবৈধ, নিষ্ঠুর এবং কয়েকটি কারণে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
প্রথমত, ইতিহাসে এ দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেসব সরকার টিকে থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের পতন ঘটানো যায় না। হ্যাঁ, নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করতে পারে; চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকারী নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ক্ষমতাধর করতে পারে এবং মার্কিন বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু এগুলো সরকারের পতন ঘটাতে পারে না।
বিশ্ব তেল বাজারের মৌলিক হিসাবনিকাশ বিবেচনা করুন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব ইতোমধ্যে তার মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ হারিয়েছে; বেসেন্ট সেখান থেকে ইরানি তেল রপ্তানিও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব করছেন। যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয়, জাপানি ও অন্য মিত্রদের ওপর চেপে বসা বর্তমান স্ট্যাগফ্লেশন বা মন্দা ও মূল্যস্ফীতির জোড়া ধাক্কা সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। এরই মধ্যে ওই দেশগুলোকে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের নিজেদের অর্থনীতিকেই স্তব্ধ করে দেবে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য চীন, যে দেশটি ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ব্যাংক অব চায়না বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নাকে নিষিদ্ধ করে, তবে বেইজিং কেবল একটি মৃদু কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েই শান্ত থাকবে না। তারা তাদের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি সীমিত করবে। কারণ তারা এই পরীক্ষা একবার চালিয়ে জিতে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অবৈধ– এমন মতামত কেবল চীনা সরকারের একার নয়। জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) যে কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকির ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে। জাতিসংঘ সনদকে যুক্তরাষ্ট্রের এই বুড়ো আঙুল দেখানো কেবল ইরানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হলো সেই দেশ, যে জাতিসংঘভিত্তিক বহুপাক্ষিকতার সঙ্গে সবচেয়ে কম সামঞ্জস্য রাখে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ২০২৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নিবন্ধিত প্রস্তাবগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
এই পর্যায়ে এসে প্রতিটি সরকারের তিনটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অবিশ্বাস্য। তৃতীয়ত, ডলারভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ভঙ্গুর করে তোলে।
বিশ্বজুড়ে দেশগুলো এখন নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। যেমন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত মক্কা চুক্তি। প্রত্যাশিতভাবেই তারা মার্কিন ডলারে লেনদেন থেকে সরে আসছে এবং নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ট্রেজারি ঋণের পরিমাণ কমাচ্ছে। মার্কিন মালিকানাধীন এআই মডেলের পেছনে অর্থ না ঢেলে তারা এখন এআই চাহিদা মেটাতে চীনের ওপেন-ওয়েট এআই মডেলগুলোর দিকে ঝুঁকছে।
আমাদের যুগে থুসিডাইডিসের পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের ঐতিহাসিক বিবরণকে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি হিসেবে পড়া হচ্ছে। এর মধ্যে বিখ্যাত বাক্যটি ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪১৬ অব্দে মেলোসের অধিবাসীদের উদ্দেশে এথেন্সের জেনারেলদের দেওয়া সেই তাচ্ছিল্য– ‘শক্তিশালীর যা করার ক্ষমতা আছে তা-ই করে, আর দুর্বলকে যা ভোগার তা-ই ভুগতে হয়।’ অথচ এথেনীয় জেনারেলদের এই তাচ্ছিল্যের মাত্র এক যুগ পর স্পার্টার হাতে স্বয়ং এথেন্সই পরাজিত হয়েছিল।
জেফ্রি ডি স্যাক্স: অধ্যাপক ও পরিচালক, সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি; সিবিল ফারেস: উপদেষ্টা (মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা), জাতিসংঘ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন্স নেটওয়ার্ক; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক