অন্যদৃষ্টি
বাল্যবিবাহ ঠেকানোই কি যথেষ্ট?
রীমা ইসলাম
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রশাসনের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সাফল্যের গল্পটি শুরু হয় সাধারণত অভিযানে আর শেষ হয় একটি মুচলেকায়। এছাড়াও কখনও জরিমানা, কখনও কারাদণ্ড আবার কখনও বিয়ের আসর থেকে বরপক্ষকে ফেরত পাঠানো। তারপর ঘটনাটি নথিভুক্ত হয়–একটি বাল্যবিবাহ রোধ করা হয়েছে। কিন্তু যে মেয়েটিকে বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে আনা হলো, তার পরের গল্প কোথায়? সে কি পরদিন স্কুলে গেল? তার বাবা-মা কি সত্যিই সিদ্ধান্ত বদলালেন? নাকি প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়ার পর পরিবারের ওপর সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা মেয়েকে ঘরে রাখা নিরাপদ নয়–এই পুরোনো যুক্তিগুলো আবার ফিরে এলো?
এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দিনে বন্ধের নোটিশ, রাতে কবুল–নওগাঁ জেলাকে নিয়ে ২৩ আগস্ট সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই শিরোনামটি শুধু একটি বাক্য নয়। এটি বাল্যবিবাহ রোধের বর্তমান ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। দিনে প্রশাসন একটি বিয়ে বন্ধ করল, রাতে আবার সেই বিয়ে অন্য কোথাও হলে তাকে কতটা সাফল্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে?
উত্তর–না। বাল্যবিবাহ শুধু একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে নির্মূল করা যাবে না। কেননা এর পেছনে থাকে অনেক কারণ। পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তার ভয়, শিক্ষা সুযোগের অভাব, মেয়েশিশুকে নিয়ে পুরোনো কিছু ধারণা। বিয়ে বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে এসবও ভাবতে হবে। অথচ বাস্তবে এসব ভাবা হয় না। কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেল; আর প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গেল, বিয়ে বন্ধ হলো। তারপর সবাই যার যার কাজে। মেয়েটি রয়ে গেল একই বাড়িতে। পরিবারের মানসিকতাও বদলালো না। এই জায়গাতেই বড় প্রশ্ন।
বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আরেকটি বিপদ দেখা দেয় নিবন্ধন এড়িয়ে গোপনে বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। কাজির ওপর নজরদারি বাড়ায় কেউ কেউ নিবন্ধিত বিয়ের পথে যাচ্ছে না। তবে আত্মীয়ের বাড়ি, অন্য উপজেলা কিংবা রাতের আঁধারে মৌলভি ডেকে বিয়ে পড়ানোর ঘটনা ঘটছে। এ কারণে প্রশাসনের পক্ষে বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ যে বিয়ের কোনো নথি নেই, সেটি পরবর্তী সময়ে প্রমাণ করাও কঠিন। অথচ সেই মেয়েটি যখন স্বামীর বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হবে, স্বামী তাকে অস্বীকার করবে কিংবা ভরণপোষণ নিয়ে সমস্যা হবে, তখন সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়বে সেই।
নওগাঁর প্রতিবেদনে আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছে। প্রশাসনের সহায়তায় নওগাঁয় গত তিন বছরে ৫০টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে একটি সংস্থা ‘মৌসুমী’। উদ্বেগের বিষয় হলো, সেগুলোর অধিকাংশ পরে আবার বিয়ে হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। রাণীনগরে একটি বিয়ে বন্ধ হয়েছিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে। এমনকি তার লেখাপড়ার দায়িত্বও নেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর মেয়েটির পরিবার আবার বিয়ে দিয়েছে।
বাল্যবিবাহ ঠেকানোর সাফল্য শুধু কতটি বিয়ে বন্ধ হলো এই সংখ্যায় মাপা উচিত নয়। বরং খোঁজ রাখা দরকার, বন্ধ করা বিয়েগুলোর কতটি আর হয়নি? কতজন আবার স্কুলে ফিরেছে? কতজন ১৮ বছর পর্যন্ত নিরাপদে থেকেছে?
বাল্যবিবাহ যখন সামাজিক ব্যাধি, তার চিকিৎসাটিও সামাজিক হতে হবে। প্রশাসন থাকবে, পুলিশ থাকবে, আদালত থাকবে–তার সঙ্গে থাকতে হবে শিক্ষক, পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় লোকজন। আরও দরকার মেয়ে শিশুকে ‘সমস্যা’ হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে দেখা। কেননা শৈশব পার করা মেয়েটিরও স্বপ্ন থাকে, পছন্দ থাকে। তার পড়ার ইচ্ছা এবং স্বপ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সাফল্যের হিসাবটিও বদলাতে হবে। ‘আজ পাঁচটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে’–এই খবরের সঙ্গে থাকতে হবে–‘গত বছর বন্ধ করা পাঁচটি বিয়ের পাঁচ মেয়ের মধ্যে পাঁচজনই স্কুলে যাচ্ছে।’ তখনই হয়তো বলা যাবে, আমরা শুধু বিয়ের আসর ভাঙিনি; মেয়ের ভবিষ্যৎও রক্ষা করেছি।
রীমা ইসলাম: সাংবাদিক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি