শিক্ষাঙ্গন
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছর এ সময়ে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আমেজ থাকলেও এবারের চিত্র এখনও ভিন্ন। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর, তপশিল ঘোষণা হয় ২৯ জুলাই। ১৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বর মাস এলেও ডাকসুর পরবর্তী নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হয়নি। সম্প্রতি ডাকসু নেতারা এর পঞ্চম কার্যনির্বাহী সভায় পরবর্তী নির্বাচনের তপশিল ১২ সেপ্টেম্বর ঘোষণার দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ২০ আগস্ট প্রভোস্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর অবশ্য বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সক্রিয় ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করার পাশাপাশি শৃঙ্খলা পরিষদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ৩৬৫ দিন পর ৯০ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবে। বর্ধিত এই সময়েও ডাকসু নির্বাচন করতে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই তপশিল ঘোষণা করতে হবে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চলছে ঢিমেতালে। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাজেটও রাখেনি বলে সহযোগী একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। উক্ত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য কোনো বাজেট রাখা হয়নি। যদি নির্বাচন হয়, সেটি ঘাটতি বাজেট থেকে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যেভাবে ‘যদি’ বলছেন, সেটি খটকা লাগারই মতো। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডাকসু নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারভুক্ত করার দাবি থাকলেও প্রশাসন সেটি করেনি।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী? আমরা দেখেছি, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারিতে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যেসব ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হবে, হিসাব অনুযায়ী সবগুলোরই পরবর্তী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও সেই উদ্যোগ নেয়নি।
গত বছরের এই সময়ে আমি লিখেছি, ২০১৯ সালে একবার ডাকসু নির্বাচন হলেও সাড়ে তিন দশক ধরে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুপস্থিত। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, যেখানে সব দলের সহাবস্থান থাকবে (ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং কর্তৃপক্ষের দায়, সমকাল, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। তারপরই আমরা ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু ও জকসু নির্বাচন বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে। এ বছরের শুরুতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা শাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তা আদালতে ঝুলে আছে।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছর যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা যেমন জরুরি, তেমনি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছাত্র সংসদ কার্যকর প্রয়োজন। এটি কেবল গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নয়, ছাত্রসমাজেরও দাবি। ক্ষমতাসীন বিএনপি যদি এই দাবি পূরণ করতে পারে, এটি তাদের জন্য হবে বড় অর্জন। আমরা দেখেছি ছাত্রদল গত বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়েছে। ছাত্র সংসদ কার্যকরের বিষয়ে দলটি ইতিবাচক। গত বছর ছাত্র সংসদগুলোতে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের জয়জয়কার অবস্থান থাকলেও ছাত্রদল আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। যদিও নব্বইয়ের দশকে ছাত্রদল ডাকসুসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদে বিজয়ী হয়েছিল। ছাত্রদলের নেতৃত্বে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা এলে এবং ছাত্রদের পক্ষে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করলে এবারও তারা ভালো করতে পারে।
এখন জরুরি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারে। ইতোমধ্যে সে প্রক্রিয়া কিছুটা শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত তপশিল ঘোষণা করলে, তা যেমন বর্তমান কমিটির বর্ধিত মেয়াদের মধ্যেই পরবর্তী নেতৃত্ব আসতে পারে, তেমনি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাকে অনুসরণ করে প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
ছাত্র সংসদগুলোতে নির্বাচনের প্রক্রিয়া জোরদার না হওয়ায় ইতোমধ্যে নির্বাচনের অনিশ্চয়তার প্রশ্নটি উঠছে। কারণ দলীয় সরকারের সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার নজির ভালো নয়। শিক্ষার্থীসহ অংশীজনের প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও প্রায় তিন দশক বা কোথাও আরও বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অচলাবস্থা থাকার কারণ অস্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলগুলো চেষ্টা করেছে শিক্ষাঙ্গনে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে। আওয়ামী লীগের সময় ছাত্রলীগের মাধ্যমে সেটি কতদূর বিস্তৃত হয়েছে, তা আমরা দেখেছি।
বিএনপি নেতাদের কথায় যেমন এটা স্পষ্ট, শিক্ষাঙ্গনে আগের মতো দখলবাজির রাজনীতি চলবে না তেমনি তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলও বলছে, তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে চায়। সে জন্য জরুরি ছাত্র সংসদ নির্বাচন। শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারে বিষয়টি যুক্ত হলে স্বাভাবিক নিয়মে ও নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন হওয়া নিয়ে আর ধোঁয়াশা থাকবে না।
এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত জনমনে নেতিবাচক ধারণা পোক্ত হওয়ার আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা শুরু করতে পারে। গত বছর যেহেতু বহু বছরের খরা কাটিয়ে নির্বাচন হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও প্রত্যাশিত, অর্ভুক্তিমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু ছাত্র সংসদ নির্বাচন এ সরকার উপহার দিতে পারে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]