সমাজ
মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝব কবে
ফারহানা সাঈদ
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মায়ের ‘নাড়ি ছেঁড়া ধন’ সন্তানের শেষ আশ্রয়স্থল মা-ই। বিপদে সন্তানকে সর্বশক্তি দিয়ে তিনি বাঁচাতে চেষ্টা করেন। এমনকি সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের মৃত্যুবরণের নজিরও কম নেই। তবে সম্প্রতি ‘নোয়াখালীতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ১৪ দিন বয়সী নবজাতককে হত্যা’ করার খবর সন্তানের জন্য মায়ের নিঃস্বার্থ ভালবাসাকে যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত বছর এপ্রিলেও গাজীপুরের টঙ্গীতে দুই শিশুসন্তান ওমর (৪) ও মালিহাকে (৬) বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার দায় আদালতে স্বীকার করেছিলেন মা আলেয়া বেগম। নিজ গর্ভজাত সন্তানকে হত্যার ঘটনা কেবল বাংলাদেশে নয়; বিশ্বজুড়ে দেখা যায়।
এ ধরনের ঘটনার পেছনে বিশেষজ্ঞরা যেসব কারণ চিহ্নিত করেন, এর প্রধানতম ‘প্রসবোত্তর বিষণ্নতা’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন’ পিপিডি। এই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক নতুন মাকে প্রভাবিত করে। পিপিডি মায়ের মানসিক সুস্থতা, শিশুর সঙ্গে বন্ধনের ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জীবনমানে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানকে খুনের ঘটনা তো সর্বোচ্চ মাত্রার মানসিক সমস্যা; প্রসব-পরবর্তী সময়ে ভুলে যাওয়া বা মনঃসংযোগের সমস্যা কমবেশি প্রায় সব মায়ের ক্ষেত্রেই ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটাকে ‘মামি ব্রেন’ বা ‘পোস্টপার্টাম ব্রেন ফগ’ বলা হয়। এ কারণে দুর্ঘটনার নজিরও রয়েছে।
প্রসব-পরবর্তী সপ্তাহ বা মাসগুলোতে চরম বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও ক্লান্তির মতো উপসর্গের মাধ্যমে পিপিডি চিহ্নিত করা যায়। এটি নারীর নিজের ও সন্তানের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। জটিল গর্ভাবস্থা বা প্রসব, আর্থিক অসুবিধা, গর্ভাবস্থা ও পরবর্তী সময়ে স্বামীসহ পরিবারের সহায়তার অভাব, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন পিপিডির ঝুঁকি বাড়ায়। যেসব নারীর পারিবারিক ইতিহাসে বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক ব্যাধি রয়েছে, তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। অপুষ্টি, ব্যায়ামের অভাব, অপর্যাপ্ত ঘুমও বিষণ্নতা বাড়াতে পারে।
সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপরই অনেক মা পিপিডিতে আক্রান্ত হন। কিন্তু পরিবার অনেক ক্ষেত্রে এই বিষণ্নতাকে চিহ্নিত করতে পারে না।
আমাদের দেশে সাধারণত প্রসবের পর মায়েরা একাই সন্তানের পরিচর্যা করেন। এর সঙ্গে আবার সাংসারিক অন্যান্য কাজও যোগ হয়। নোয়াখালীর সেই মায়ের মতো কেউ ১৪ দিন না ঘুমিয়ে কাটালে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন হবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ শতাংশ নারী গর্ভকালে এবং ১৩ শতাংশ নারী প্রসব-পরবর্তী সময়ে বিষণ্নতাসহ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভোগেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার আরও বেশি– গর্ভাবস্থায় ১৫.৬ শতাংশ এবং প্রসবের পর ২০ শতাংশ। এ সমস্যার সমাধান করা না হলে মায়েদের মানসিক কষ্ট এতটাই বাড়তে পারে, তা আত্মক্ষতি বা আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি করতে পারে।
ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বে পিপিডি বিষয়ে সচেতনতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে মানসিক চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত অবহেলিত, সেখানে মায়েদের পিপিডি নিয়ে চিন্তা করাই বিলাসিতা। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ও নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের মানসিকভাবে সুস্থ থাকার গুরুত্ব উপলব্ধি না করলে আমাদের আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন মা স্বাভাবিক, সুস্থ মস্তিষ্কে নিজ সন্তানকে হত্যা করতে পারেন না। কাজেই নতুন মা, তাদের পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ এবং সহায়তা নিশ্চিত করতে পিপিডি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্বামীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যকেও সচেতন হতে হবে। মায়ের মানসিক সমস্যা প্রতিরোধে গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার সময় থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রসবের পর মা নিজেও নবজাতককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে মায়ের যত্ন ও বিশ্রাম ব্যাহত হয়। তাই স্বামীসহ পরিবারের সব সদস্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।
এ ছাড়া প্রসবকালে মায়েদের প্রতি পরিবারের সদস্য, এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীও যেন সম্মানজনক আচরণ করে এবং কোনো ধরনের নির্যাতন বা অসদাচরণ না হয়, সে জন্য সরকারের দিক থেকে নির্দেশিকা প্রণয়ন করা জরুরি।
ফারহানা সাঈদ: লেখক ও গবেষক; উপপরিচালক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
- বিষয় :
- সমাজ