ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুর্যোগ

নেপাল হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা এবং আমাদের প্রেক্ষাপট

নেপাল হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা এবং আমাদের প্রেক্ষাপট
×

ছবি: রয়টার্স

এম. এ. হালিম

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৪২

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াভহতম হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয়। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আরও পরে জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে, ক্ষতি পুনরুদ্ধারে ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন হবে। যদিও অনেক মানুষের মৃত্যুজনিত পরিবারসমূহের ক্ষতি আর্থিক মানদণ্ডে পরিমাপযোগ্য নয়। 

ইউএসজিএসের প্রাথমিক তথ্য অনুসারে হিমালয় পর্বতে সংঘটিত ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পকে এ হিমাবহধস ও বন্যার নেপথ্য কারণ উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে ভূতত্ত বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, হিমালয়ের ৫.২ কিলোমিটার উপরে লাংটা নিরুং চুড়ায় ৫ লাখ ঘনমিটারের একটি হিমবাহ ১.২ কিলোমিটার নিচে উপত্যকায় দেবে যাওয়ায় প্রচণ্ড গতির ধ্বংসবাশেষ স্রোতে পরিণত হয়, যা ভোটেকোশি নদী বেয়ে তীরবর্তী বাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার  জনপথ, স্থাপনা ও গ্রাম—গ্রামান্তরে ১০০ কিলোমিটারজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ দুর্যোগের ধ্বংস থেকে রেহাই পায়নি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ—কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়া, হিমালয় ও হিমালয় পাদদেশে, বিশেষত কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের থাকা ৩৫ দেশের অসংখ্য পর্যটক নিহত অথবা নিখোঁজ হন। 

দুর্যোগে ব্যবস্থাপনায় (প্রস্তুতি ও ঝুঁকিহ্রাস, সাড়াদান, পুনরুদ্ধার ইত্যাদি) নেপালকে এ অঞ্চলের পথিকৃৎ বলা হয়। নেপালে রয়েছে জাতীয় থেকে গ্রাম পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। রয়েছে স্থানীয় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। ২০১৫ সালে নেপালে সংঘটিত গোরখা ভূমিকম্প পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে প্রথমদিকে বিদেশি বিশেষজ্ঞকে স্বাগত জানালেও এক পর্যায়ে নিজস্ব সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বিবেচনায় আর কোনো বিদেশি বিশেষজ্ঞকে অনুমতি দেয়নি। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝঁকিহ্রাস ও ব্যবস্থাপনা অ্যাক্ট ২০১৭ অনুসারে জাতীয় দুর্যোগে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিধায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি দক্ষ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত। দুর্যোগ সাড়াদানে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও পারস্পরিক সহযোগিতা এক প্রতিষ্ঠিত প্রথা বিবেচিত হলেও নেপাল প্রথমে চলমান দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন দেশে সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তবে এ দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক নিখোঁজ হওয়ায় তাদের চাপে এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এ কথা স্বীকার্য, সক্ষমতা ও প্রস্তুত যতই থাকুক প্রকৃতি নতুন আবর্তে মানুষের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করবেই। নেপাল ভূমিধ্বস ও আকস্মিক বন্যা এমন হঠাৎ করেই ঘটেছে, যেখানে কোনো প্রস্তুতিই কার্যকর ছিল না। 

নেপাল হিমবাহধস ও বন্যার প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণের জন্য সময় প্রয়োজন। এরই মধ্যে নেপাল চীনকে দায়ী করে অভিযোগ করেছে, চীন সময়মতো সতর্কবার্তা দেয়নি। চীন বলেছে, হিমবাহধসের ঘটনা ঘটেছে নেপাল সীমান্তে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণায়ণের ফলে হিমালয়ের বরফ গলাকেও এই ধ্বসের কারণ হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে। অন্যদিকে গবেষণা সূত্রে বলা হচ্ছে, তুষারধসের কারণে হিমালয়ের পর্বতের হিমবাহ ভেঙ্গে আকস্মিক বন্যার তথ্য ২০১৯ সালেও দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই হিমবাহধসের প্রকৃত কারণ, পূর্ব-সংকেতের সত্যতা এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা সম্পর্কে আরও জানা যাবে।  

নেপালের ঢলের পানি ইতোমধ্যে ভারতের বিহারে গণ্ডক নদীতে পৌঁছেছে। পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা হয়ে গঙ্গা (বাংলাদেশের পদ্মা) দিয়ে বাংলাদেশেও এর প্রবাহ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এ পানি প্রবাহের তীব্রতা ততক্ষণ স্তিমিত হবে ধরা যায়। ফলে বাংলাদেশে ক্ষতির আশঙ্কা তেমন নেই। তবুও ‘কিছইু হবে না’ ভেবে নিশ্চিত না থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ ২০২৫ সালের ফেনীর আকস্মিক বন্যার কোনো পূর্বাভাস ছিল না, ভারত থেকে এমন বিধ্বংসী পানি প্রবাহ আসতে পারে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগে আমার অভিজ্ঞতায় বলা যায়, ১৯৯৯ সালে সংঘটিত গোমতি বাঁধের ভাঙ্গনের ফলে গোমতী তীরবর্তী গ্রামগুলোর ওপর ঘটে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কেও কোনো পূবার্ভাস ছিল না।

বাংলাদেশে হিমালয়ের মতো অতি উঁচু পর্বত নেই। কিন্তু আছে বান্দরবানের কেউক্রাডংএর মতো অনেক শৃঙ্ঘ। আছে ৬৮৮ কিলোমিটারব্যাপী কাপ্তাই লেক, যার পুরোটাই ছোট—বড় পাহাড়বেষ্টিত। আমার জানামতে, বাংলাদেশে যেসব জরিপ পরিচালিত হয়েছে, তা প্রধানত আপৎ মানচিত্র, ভূমিধ্বস ও সম্পদের প্রাপ্যতা, ইত্যাদি নির্ণয়ের জন্য করা। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ না হয়েও অনুমান করি, আমাদের পাহাড়-পর্বতে সাধারণ ভাষায় ‘ত্রুটি’ আছে বলেই পাহাড়ধস নৈমিত্তিক ঘটনা। তাই ভূতাত্ত্বিক জরিপের উদ্দেশ্য শুধু হ্যাজার্ড ম্যাপ নয়, তা হতে হবে বহুমুখী লক্ষ্যকে সামনে রেখে; যেমন— ভৌগলিক অবস্থাগত তথ্য ও সেখানকার অভ্যন্তরীণ অবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রস্তুতি, স্থানীয় সক্ষমতা জানা এবং উন্নয়নের উদ্যোগ। উন্নয়নের অংশ হিসেবে পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটকের নিরাপত্তা ও উৎসাহ প্রদানকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া, ৬৮ বছর পূর্বে ১৯৬২ সালে নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ এবং তাকে কেন্দ্র করে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাকালীন বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটের সাথে সমকালীন প্রেক্ষাপট যেমন— অবকাঠামোগত অবস্থা বিশ্লেষণ, নেপালের মতো দুর্যোগে হলে লেক—পরিবেষ্টিত ৫৫ হাজার মানুষের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি, লেককে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প ইত্যাদি বিবেচনার করার এখনই সময়। 

দুর্যোগে পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি অনেক মানুষের জীবিকায়নের পথ থমকে যায়। তাই নেপালের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে দেশব্যাপী সাধারণ জরিপের পাশাপাশি দেশের সমগ্র পাহাড়ি এলাকার ভূ—তাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে সেখানকার ঝুঁকিসমূহ নির্ধারণকরত তা বিপদাপন্ন মানুষের মধ্যে প্রচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রসঙ্গত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপানায় বাংলাদেশর অর্জনও বহুল প্রশংসিত। জাতীয় থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে আমাদেরও আছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তথা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। কিন্তু বাস্তবে কতগুলো কমিটি কার্যকর, কমিটিগুলো কতটা ক্ষমতায়িত এবং জাতীয় বাজেটে কমিটির জন্য কতটা তহবিল বরাদ্দ থাকে, তা বিবেচনা করতে হবে। জানা যায়, সরকারের দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (এসওডি) ২০১৯ বর্তমানে সংশোধনাধীন। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর যেন সংশোধিত এসওডিতে প্রতিফলিত হয় তা বিবেচনার প্রস্তাব রইল। 
এ ছাড়া, দুর্যোগে প্রাণহানি কমাতে ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভূমিধসেরও পূর্বসংকেত ব্যবস্থা উদ্ভাবন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। জানা গেছে, নেপালের ত্রিভূবন ত্রিগুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি তার বন্ধুর নিকট থেকে বন্যার স্রোত স্কুলের দিকে ধেয়ে আসছে, এ সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক স্কুল ছুটি দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলায় ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা পায়। এ ঘটনা সঠিক সময়ে দুর্যোগের বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যমে মানুষের জীবন বাচাঁনো সম্ভব, এ কথা আর একবার জানান দিলো। 

এম. এ. হালিম: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক পরিচালক 

আরও পড়ুন

×