সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রেমনির্ভর নাটক-সিনেমা বন্ধের নোটিশ কী বার্তা দেয়
মোশতাক আহমেদ
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ২৭ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী দেশে প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ বন্ধে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটক শিল্পে কেবলমাত্র প্রেম এবং মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের ব্যাপক আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের কনটেন্টের ক্রমাগত সম্প্রচারের ফলে একটি চরম সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ারের প্রতি মারাত্মকভাবে অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। এছাড়া এসব নাটক ও সিনেমায় পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক কাঠামোকে চরমভাবে ধ্বংস করছে’ (ইত্তেফাক, ২৭ আগস্ট)। স্বাভাবিকভাবেই এই আইনি নোটিশ ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সমালোচনার ঝড়। প্রশ্ন উঠেছে–প্রেমকে এত ভয় কেন?
আসলে প্রেম নয়, ভয় মুক্ত সংস্কৃতিকে। প্রেম-ভালোবাসা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় হলেও এর আবেদন সর্বজনীন। তাই সেগুলো শিল্প-সাহিত্যেরও অন্যতম প্রধান উপজীব্য। দুজন ব্যক্তির এই একান্ত সম্পর্ক যখন শিল্পের রসে জারিত হয়ে সাহিত্য-নাটক-সিনেমা বা ললিতকলার যে কোনো শাখায় উপস্থাপিত হয়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত থাকে না; হয়ে ওঠে সভ্যতার স্মারক, সমাজ ও সংস্কৃতির অগ্রসরমানতার প্রতীক। আদিতে মানব-মানবীর সম্পর্ক ছিল আর দশটা প্রাণীর মতো নিতান্তই শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক। তাতে পারস্পরিক সম্মান-শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ–এককথায় মনের মিল বলে কিছু ছিল না বললেই চলে। তবে সমাজ যত এগিয়েছে তত মানব-মানবী সার্বিক অর্থে পরস্পরের মূল্য বুঝতে শিখেছে; সেই সঙ্গে শুধু দেহের টানে নয়, মনেরও টানে পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে; যাকে আজকে বলা হচ্ছে মানব-মানবীর প্রেম বা ভালোবাসা। মানব-মানবীর সম্পর্ক এই পর্যায়ে এসেছে বলেই তা শিল্প-সাহিত্যেরও বিষয় হয়ে উঠেছে।
সে জন্যে প্রেম-ভালোবাসাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের টুঁটি চেপে ধরা মানে মুক্ত সমাজ-সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরে তার গতিমুখ বদলে দেওয়া। সে কারণে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও আলোচ্য নোটিশটিকে তেমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
এমন এক সময়ে এই আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘তৌহিদী জনতা’র বিরোধিতার কারণে একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ঘরের বাইরে নারী কোন পোশাক পরবে, তারা কতক্ষণ বাইরে থাকতে পারবে, কোন খেলা তারা খেলতে পারবে ইত্যাদি বিষয়ে কঠোরতা আরোপের আয়োজন চলছে। এমনকি সাধারণ লেখালেখির ওপরও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে নানা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যেদিন এই আইনি নোটিশটি দেওয়া হয়, সেদিনই মেহেরপুরে একজন লেখককে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে দেওয়া একটি উড়োচিঠিতে লেখালেখি বন্ধ করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। অন্যথায় ‘প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন না’ বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। ভুক্তভোগী হাসান ইমাম রুবেল দীর্ঘ সময় প্রথম আলোতে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের আউটপুট এডিটর এবং নিউজবাংলার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। অবশ্য লেখালেখি নিয়ে তৌহিদী জনতার এই ধরনের আপত্তি নতুন কিছু নয়। এর আগেও হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায়কে তাদের লেখার কারণে খুন হতে হয়েছে। প্রেম নিয়ে নাটক-সিনেমা বন্ধ করার এই প্রয়াস সম্ভবত এই দেশে প্রথম।

অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে; যার রয়েছে হাজার বছরের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য–হুট করে প্রেমনির্ভর নাটক-সিনেমা বন্ধ করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তবে এ কথা ভেবে তুষ্ট মনে বসে থাকার অবকাশ নেই। এখানে তো একসময় এ স্লোগান তোলা হয়েছিল যে ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। গত দুই দশকের নানা ঘটনা দেখিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে সেই স্লোগানদাতাদের শক্তি ইতোমধ্যে বেড়েছে বৈ কমেনি। আমরা কি দেখিনি, ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর নারীকে কীভাবে শুধু অফিস-আদালত বা বাইরের কর্মস্থল নয়, স্কুল-কলেজও ত্যাগ করে ঘরের কোণে ঠাঁই নিতে হয়েছে? ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তালেবান প্রশাসন ‘কবিতা নিয়ন্ত্রণ আইন’ নামে একটি আইন জারি করে। ১৩টি দফাসংবলিত এই আইনে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, জাগতিক প্রেম বা রোমান্টিক অনুভূতি প্রকাশ করে এমন যে কোনো নাটক, সিনেমা, কবিতা বা সাহিত্যচর্চা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো লেখক বা কবি যদি এই আইন অমান্য করে প্রেমের কবিতা লেখেন, তবে তাঁকে ‘শরিয়াহসম্মত কঠোর শাস্তি’র–যার মধ্যে চাবুক মারা, কারাদণ্ড বা পরিস্থিতিভেদে সর্বোচ্চ শাস্তি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে–নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমি জানি না, বর্তমান আফগান শাসকদের চিন্তা নোটিশদাতাকে উদ্বুদ্ধ করেছে কিনা। তবে তাঁর আফগান ওই বিধিবিধান জারির সঙ্গে এই আইনি নোটিশের সময়কাল ও ভাষাগত মিল ভাবিয়ে তোলার মতো; যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা–খাদ্য, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা–নিয়ে দেশ ধুঁকছে, সেখানে প্রেমকে টার্গেট করে একটি আইনি নোটিশ আসলে কতটুকু প্রেমকেন্দ্রিক আর কতটুকু সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রেম-ভালোবাসার কাহিনিনির্ভর সাহিত্য বা সিনেমা এ দেশ আবিষ্কার করেনি, কোনো বিধর্মীও তার প্রচলন ঘটায়নি। এখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি যেমন ধর্মনির্বিশেষে মানুষকে আপ্লুত করেছে, তেমনি সুদূর আরব ও পারস্যের ইউসুফ-জুলেখা, শিরি-ফরহাদ, লাইলি-মজনু ইত্যাদি প্রেমকাহিনি নিয়েও বহু নাটক-সিনেমা তৈরি হয়েছে। এসব নাটক-সিনেমা শুধু বিনোদন জোগায়নি, শত-সহস্র বছর ধরে মানুষকে শিক্ষিত-সমৃদ্ধ করে চলেছে। যে সমাজ ও সাহিত্য হাজার বছর ধরে প্রেমকে ধারণ করে এসেছে, সেই সমাজে হঠাৎ প্রেমকে ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় বানিয়ে তোলার চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই প্রবণতা যে উদ্বেগজনক এবং সতর্কতার দাবি রাখে, তা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। এ কাজে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর মতো লোকেরা যদি একবার সফল হয়, তবে তা কেবল শিল্প-সাহিত্যকে নয়, গোটা সমাজের চিন্তা-চেতনার স্বাধীনতাকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলতে পারে। তাই সময় থাকতে সাবধান হওয়াই ভালো।
মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।
- বিষয় :
- মোশতাক আহমেদ
- প্রেম
- নাটক
- সিনেমা