গবেষণা
বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সংখ্যায় মাপা যায়?
মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত
মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিজ্ঞান জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি। বিজ্ঞানীর কাজ শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নতুন প্রশ্ন করেন, নতুন ধারণা তৈরি করেন, জটিল সমস্যার সমাধান খোঁজেন, গবেষণার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেন, গবেষণাগার ও গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলেন, তরুণ গবেষকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং দেশের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখেন। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর সামগ্রিক অবদান মূল্যায়নে কি এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করি? নাকি ধীরে ধীরে একজন বিজ্ঞানীকে কয়েকটি সংখ্যায় পরিণত করছি– কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন; কতবার তাঁর গবেষণাপত্র উদ্ধৃত হয়েছে; তাঁর এইচ সূচক কত। প্রশ্নটি নিছক একাডেমিক নয়; দেশের গবেষণা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞাননীতি এবং জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পদ্ধতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গবেষণাপত্রের সংখ্যা, উদ্ধৃতি এবং এইচ সূচক একজন গবেষকের কাজের কিছু দিক সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তাঁর গবেষণা কতটা দৃশ্যমান এবং অন্যান্য গবেষক কতটা ব্যবহার করছেন, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এসব সূচকের মূল্য রয়েছে। প্রাথমিক তুলনার জন্যও উপকারী। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এসব পরিমাপক পুরো মূল্যায়নের বিকল্প হয়ে ওঠে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। গবেষক ‘ক’ একটি বড় আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্র এবং বিপুলসংখ্যক উদ্ধৃতি রয়েছে। অন্যদিকে গবেষক ‘খ’ একটি উন্নয়নশীল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করছেন। তাঁর প্রকাশনা ও উদ্ধৃতি তুলনামূলক কম। কিন্তু তিনি নিজ উদ্যোগে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন, গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন, নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন এবং তরুণ গবেষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যারা পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। শুধু প্রকাশনা ও উদ্ধৃতির সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে গবেষক ‘ক’ এগিয়ে থাকবেন। কিন্তু গবেষক ‘খ’-এর দীর্ঘমেয়াদি অবদান কি কম গুরুত্বপূর্ণ? বিজ্ঞানীর প্রভাব শুধু তাঁর নিজ গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি কিংবা নতুন জ্ঞানক্ষেত্র বিকাশের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পেতে পারে।
গবেষণাপত্র ও উদ্ধৃতিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের পাশাপাশি কীভাবে বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ বা উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, সেটিও লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে মানের সঙ্গে আপস করে অতিরিক্ত প্রকাশনা, একই গবেষণাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিক গবেষণাপত্রে ভাগ করা, উদ্ধৃতি বাড়ানোর চেষ্টা এবং প্রকৃত গুরুত্বের পরিবর্তে দৃশ্যমানতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন বিজ্ঞানী তৈরি করতে চাই, যারা বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন? নাকি যারা গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান সৃষ্টি করেন? দুটিই কাম্য; কিন্তু একটিকে অন্যটির বিকল্প বানানো উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব গবেষণাক্ষেত্রে উদ্ধৃতির হার এক নয়। কোনো ক্ষেত্রে ফল দ্রুত বৃহৎ গবেষক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়েই বিপুল উদ্ধৃতি পেতে পারে। আবার বিশেষায়িত বা ছোট গবেষণাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও সীমিত উদ্ধৃতি পেতে পারে। গবেষণার ফল প্রয়োগ বা পরবর্তী গবেষণায় ব্যবহারের সময়ও ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন। কোনো বিশেষায়িত পদার্থের মৌলিক ধর্ম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ব্যবহারকারী হয়তো সীমিত গবেষক সমাজের মধ্যে থাকবেন। একইভাবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের গ্রাফ তত্ত্ব বা গ্রাফ অ্যালগরিদমের নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা নিয়ে মৌলিক গবেষণার ব্যবহারকারী ও পরবর্তী গবেষকদের পরিধিও তুলনামূলক ছোট হতে পারে। অন্যদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জলবায়ুবিজ্ঞানের বহুল আলোচিত গবেষণার ব্যবহারকারী অনেক বেশি। একজন গবেষকের কর্মজীবনের দৈর্ঘ্যও উদ্ধৃতির সংখ্যাকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিনের গবেষণার উদ্ধৃতি সঞ্চয়ের সুযোগ স্বাভাবিকভাবে বেশি। তাই উদ্ধৃতির সংখ্যা শুধু গবেষণার মান নয়; গবেষণাক্ষেত্রের আকার, ধরন ও সময়ের প্রভাবও বহন করে। উচ্চমানের গবেষণা হলেও সব ক্ষেত্রে উচ্চসংখ্যক উদ্ধৃতি প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
উদ্ধৃতির সংখ্যা কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। একজন গবেষক মূলত মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে যে সংখ্যক উদ্ধৃতি পেয়েছেন, আরেকজন হয়তো বহু রিভিউ প্রবন্ধ বা বইয়ের অধ্যায় প্রকাশ করে আরও বেশি সংখ্যক উদ্ধৃতি অর্জন করেছেন। এ দুই ধরনের উদ্ধৃতির বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য সব সময় এক নয়। রিভিউ প্রবন্ধ বা বইয়ের অধ্যায় বিদ্যমান জ্ঞান সংকলন ও বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেগুলোর উদ্ধৃতির ধরন মৌলিক গবেষণাপত্রের চেয়ে ভিন্ন। নিজের পূর্ববর্তী গবেষণাকে প্রাসঙ্গিক কারণে উদ্ধৃত করা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত বা ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রাসঙ্গিক আত্ম-উদ্ধৃতি এর সংখ্যাকে কৃত্রিমভাবে বাড়াতে পারে। তাই শুধু মোট সংখ্যা নয়, উদ্ধৃতির প্রকৃতি ও উৎস বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা সব দেশে বা প্রতিষ্ঠানে সমান নয়। সীমিত সম্পদে গবেষণা অবকাঠামো নির্মাণকারী এবং নতুন গবেষণা-সংস্কৃতি গড়ে তোলা বিজ্ঞানীর অবদান কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায়?
বর্তমান বিজ্ঞানে বড় যৌথ গবেষণার গুরুত্বও বাড়ছে। একটি গবেষণাপত্রে অনেক গবেষক যুক্ত থাকতে পারেন, কিন্তু তাদের অবদান সমান নয়। তাই শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা নয়, প্রত্যেক গবেষকের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক অবদানও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এখানেই জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের স্বীকৃতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। পুরস্কার বা ফেলোশিপ শুধু একজন বিজ্ঞানীকে সম্মানিত করে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও বার্তা পাঠায়, আমরা কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক অবদানকে মূল্য দিই? তরুণ গবেষকরা যদি মনে করেন, স্বীকৃতির প্রধান পথ বেশি প্রকাশনা ও উদ্ধৃতি অর্জন, তাহলে সংখ্যা একসময় গবেষণার লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। আর যদি মৌলিক গবেষণা, বৈজ্ঞানিক সততা, জ্ঞান সৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে মূল্য দেওয়া হয়, তাহলে গবেষণার লক্ষ্য আরও অর্থবহ হবে। একটি জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি তাই শুধু বিজ্ঞানীদের নির্বাচন করে না; দেশের বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখে।
তাহলে কি গবেষণাপত্র, উদ্ধৃতি ও এইচ সূচকের মতো পরিমাপক বাদ দিতে হবে? না। এগুলো একজন বিজ্ঞানীকে মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। গবেষণার মৌলিকতা ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, ব্যক্তিগত অবদান, তরুণ গবেষকদের গড়ে তোলা, গবেষণা-পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা এবং দেশ ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষত জাতীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একজন বিজ্ঞানীর কর্মজীবন ও অবদান সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞদের গুণগত বিচার অপরিহার্য। সংখ্যা বিচারকে সহায়তা করবে; সংখ্যা যেন বিচারকের স্থলাভিষিক্ত না হয়।
গবেষণাপত্র একজন গবেষকের বৈজ্ঞানিক কাজের প্রকাশিত রূপ; একটি উদ্ধৃতি সেই কাজের দৃশ্যমানতার চিহ্ন এবং এইচ সূচক তাঁর গবেষণার উদ্ধৃতিভিত্তিক প্রভাব সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। কিন্তু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণার পরিবেশ তৈরি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শক্ত ভিত্তি রেখে যাওয়ার যথার্থ মূল্য শুধু সংখ্যাগত সূচকে নির্ধারণ করা যায় না। বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের মূল্যায়নে তাই একজন বিজ্ঞানীর কাজের গভীরতা, ব্যাপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। সংখ্যার হিসাব সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে, কিন্তু সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক অবদান প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে থাকে।
মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত: অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, বুয়েট
- বিষয় :
- গবেষণা