ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বেদে কি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী

বেদে কি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী
×

দিলশাদুল হক শিমুল

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় শুধু একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়; নদী, নৌকা, লোকসংগীত, সাপ, লোকজ চিকিৎসা ও মৌখিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতির ধারক। কিন্তু আধুনিকায়ন, নগরায়ণ, নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ঐতিহ্যগত পেশার সংকোচনে তাদের জীবনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়ছে। ফলে বেদেদের পুনর্বাসনকে শুধু জমি ও ঘর দেওয়ার প্রকল্প হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি মডেল, যেখানে আবাসন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ– চারটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচিত হবে।

এ লক্ষ্যেই নদী-সংলগ্ন নির্বাচিত এলাকায় পাইলট ভিত্তিতে ‘বেদে সাংস্কৃতিক পর্যটন পল্লি’ গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি নিছক আবাসিক কলোনি নয়। তা হবে আবাসন, শিক্ষা, হস্তশিল্প, লোকসংস্কৃতি, নদী পর্যটন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সমন্বিত কেন্দ্র। বেদেদের লোকগান, নৃত্য, গল্প, নৌজীবন ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প পর্যটনের সম্পদে পরিণত হতে পারে। বাঁশ-বেতের পণ্য, খাবার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড এবং নদীভ্রমণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। তবে পর্যটনের আয় যাতে বাইরের ব্যবসায়ীদের হাতে চলে না যায়, সে জন্য কমিউনিটি কো-অপারেটিভ গঠন করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানা ও লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ প্রকল্পে বেদে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। হস্তশিল্প, খাবার, পর্যটন, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় তাদের মালিকানা ও আয় নিশ্চিত করা গেলে পুনর্বাসনের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত হবে। 

পুনর্বাসনের দ্বিতীয় স্তম্ভ হবে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ। বেদেদের ‘ঠার’ ভাষা মূলত মৌখিক; এর লিখিত ব্যবহার সীমিত। ইতোমধ্যে ভাষাটির শব্দ ও বাক্য ডিজিটালি নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে ‘ঠার ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্রবীণদের কাছ থেকে শব্দ, গল্প, গান ও মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা দরকার। বেদেদের ঐতিহ্যগত সাপ-সম্পর্কিত জ্ঞানকেও নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। তবে একে ‘জন্মগত দক্ষতা’ না বলে প্রজন্মান্তরে অর্জিত ঐতিহ্যগত জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, প্রাণিকল্যাণ ও বন্যপ্রাণী আইন মেনে তাদের সাপ সংরক্ষণ, ভেনম সংগ্রহ ও জীববৈচিত্র্যভিত্তিক পর্যটন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব। এখানে জনস্বাস্থ্যেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বেদেরা বংশানুক্রমিক সাপ ধরা, সাপের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও লালন-পালনে অবিশ্বাস্য রকম পারদর্শী। সাধারণ মানুষের জন্য যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণের বিষয়, বেদেরা তা প্রাকৃতিকভাবেই ধারণ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসাবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার এবং প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। স্থানীয় সাপের বিষের বৈচিত্র্য বিবেচনায় দেশীয় বিষ ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। সরকারও স্থানীয়ভাবে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এ ব্যবস্থায় ভেনম সংগ্রহ ও  সংরক্ষণে প্রশিক্ষিত বেদে তরুণদের সেবা যুক্ত করা যেতে পারে। এতে ঐতিহ্যগত জ্ঞান আধুনিক চিকিৎসা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হবে। 

সুতরাং বেদে পুনর্বাসনের দর্শন হওয়া উচিত– জমি দিয়ে ঠিকানা নয়, জীবিকা দিয়ে ভবিষ্যৎ; সংস্কৃতি মুছে ফেলা নয়, সংস্কৃতিকেই সম্পদে রূপান্তর। স্থায়ী আবাসন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, মাতৃভাষা সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত সাপ-সম্পর্কিত কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একত্র করা গেলে বেদে সম্প্রদায় রাষ্ট্রের সহায়তাপ্রার্থী জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের অর্থনীতির অংশীদারে পরিণত করতে পারে। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে মানবিক, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নতুন মডেল।

দিলশাদুল হক শিমুল: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আদর্শলিপি বেদেপল্লি

আরও পড়ুন

×