অর্থনীতি
বাংলা কিউআরে ডিজিটাল লেনদেন
সোহেল নওরোজ
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবী দ্রুত নগদ অর্থনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ছুটছে। এক সময় মানিব্যাগভর্তি নগদ টাকা থাকা ছিল স্বাভাবিকতার অংশ। এখন পৃথিবীর বহু দেশে মোবাইল ফোনই হয়ে উঠেছে মানিব্যাগ। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ ইতোমধ্যে ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্যভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সে যাত্রাকে আরও বেগবান করার সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলা কিউআর (কুইক রেসপন্স)।
মূলত নোটভিত্তিক লেনদেন থেকে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকারে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআরের মতো একটি অভিন্ন ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করেছে। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিউআর কেবল সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের জন্য নয়; বাংলা কিউআরের লক্ষ্য হলো–অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিএসপি) গ্রাহককে একই কিউআর ব্যবহার করে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। বাংলা কিউআর থাকার ফলে একজন ছোট দোকানির আলাদা আলাদা চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কিউআর রাখার প্রয়োজন পড়ে না। ক্রেতা যে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের অ্যাপই ব্যবহার করুক, মার্চেন্ট বা বিক্রেতার বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্য বা সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারে। এটি সঠিকভাবে সর্বত্র কার্যকর করা গেলে একটি অভিন্ন কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সব মার্চেন্ট পয়েন্টে ব্যবহৃত নিজস্ব বা পৃথক কিউআর কোড ৩০ জুনের মধ্যে বাংলা কিউআর কোড দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা প্রদান করে। এতে মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর ব্যবহার করে ক্যাশ-আউট বা নগদ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ না রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়।
তবে একটি নতুন পেমেন্ট সংস্কৃতি শুধু প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় মানুষের অভ্যাস দিয়ে। এখানেই আসে কিছু হিসাবনিকাশ। চলতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের সব লেনদেনে আইআরএফ শূন্য হবে। অর্থাৎ মার্চেন্টের অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে বাংলা কিউআর লেনদেনের বিপরীতে আর কোনো চার্জ দিতে হবে না। ফলে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানের লেনদেন-ব্যয় কমবে এবং ক্ষুদ্র মার্চেন্টের জন্য কিউআর পেমেন্ট আরও ব্যয়সাশ্রয়ী করার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টের লেনদেন উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ব্যক্তিক রিটেইল হিসাবের মাধ্যমে যুক্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টের সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত যোগ্য বাংলা কিউআর লেনদেনে (ব্যর্থ, বাতিল, ফেরতযোগ্য, চার্জব্যাক বা বিরোধপূর্ণ লেনদেন ছাড়া) অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে।
বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে ১ নভেম্বর থেকে এর মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বা পি-টু-পি লেনদেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি তার ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাবের বিপরীতে ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর তৈরি করতে পারবেন এবং অন্য ব্যক্তি সেই কিউআর স্ক্যান করে সরাসরি তার হিসাবে অর্থ পাঠাতে পারবেন। এমনকি কিউআর কোডের ছবি দূর থেকে পাঠানো হলে সেটি মোবাইল অ্যাপে আপলোড করেও লেনদেন করা যাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নিজেদের অ্যাপে কিউআর তৈরি, স্ক্যান ও আপলোডের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যুক্ত করতে বলা হয়েছে। ফলে টাকা পাঠানোর সময় হিসাব নম্বর, মোবাইল নম্বর বা অন্যান্য তথ্য বারবার টাইপ করার প্রয়োজন কমবে এবং ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে ভুল হিসাবে অর্থ চলে যাওয়ার ঝুঁকিও কমবে। মার্চেন্ট পেমেন্টের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ের অর্থ স্থানান্তরও একই অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার আওতায় এলে বাংলা কিউআর ধীরে ধীরে শুধু দোকানে দাম পরিশোধের মাধ্যম নয় বরং দৈনন্দিন ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের একটি সর্বজনীন মাধ্যম হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
উপরোক্ত সিদ্ধান্তগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হয়। একদিকে আইআরএফ শূন্য করার মাধ্যমে অ্যাকোয়ার প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমানো হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র লেনদেনে অ্যাকোয়ার ও ইস্যুয়ার–উভয় প্রতিষ্ঠানকেই প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আবার ব্যক্তি পর্যায়ে পি-টু-পি লেনদেনে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ চালু হলে এর পরিধি মার্চেন্ট পেমেন্টের গণ্ডি ছাড়িয়ে দৈনন্দিন ব্যক্তিগত অর্থ স্থানান্তরেও বিস্তৃত হবে।
মোদ্দাকথা, মানুষ তখনই বাংলা কিউআরের দিকে ঝুঁকবে, যখন নগদ অর্থের তুলনায় বাস্তবে এটি বেশি সুবিধাজনক বলে মনে হবে। পকেটে নগদ অর্থ রাখার ঝামেলা ও নিরাপত্তা-চিন্তা, ভাঙতি টাকার সংকট, জাল বা ছেঁড়াফাটা নোটের আশঙ্কা–এসবই বাংলা কিউআরের জন্য ইতিবাচক। এর সঙ্গে যদি ক্ষুদ্র লেনদেনে ব্যয় কমে যায়, অর্থ দ্রুত মার্চেন্টের হিসাবে পৌঁছে যায় এবং সেই অর্থ পরবর্তী লেনদেনে আবার ডিজিটালভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এটি কেবল একটি বিকল্প পেমেন্ট পদ্ধতি নয় বরং দৈনন্দিন লেনদেনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
সোহেল নওরোজ: যুগ্ম পরিচালক, বাংলা কিউআর ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিট, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা
[email protected]
- বিষয় :
- অর্থনীতি