ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বের বিপদ ডেকে আনছে

কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বের বিপদ ডেকে আনছে
×

আন্তর্জাতিক

ফিরাস দাবাঘ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগটি মূলত আদর্শবাদ দ্বারা চালিত ছিল, যা একটি সুদৃঢ় বহুমুখী আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল। তবে সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন চূড়ান্ত ঐতিহাসিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিতে যে নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে; যা একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত, লেনদেনমূলক জাতীয়তাবাদ এবং ঐতিহাসিক মিত্রতার নতুন হিসাব-নিকাশ দ্বারা চিহ্নিত–তা আগের আন্তর্জাতিক নীতি ও রীতি থেকে এক বড় ধরনের বিচ্যুতি নির্দেশ করে। চাপ সৃষ্টির রাজনীতি ও কৌশলী প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সংমিশ্রণে তৈরি এই নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে এক নতুন ধারণার: ট্রাম্পবাদ।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের জোর দাবি এবং এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী সুরকে একত্র করে ট্রাম্পবাদ সুনির্দিষ্টভাবে সেই মূল ভিত্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, যা বহু প্রজন্ম ধরে বিশ্ব-শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছিল। এর মূলকথা হলো, পশ্চিমা আধিপত্যশীল বৈশ্বিক নেতৃত্বের গ্র্যান্ড পরিকল্পনা থেকে সরে এসে একটি বিকেন্দ্রীভূত, স্বার্থকেন্দ্রিক এবং পুরোপুরি লেনদেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও পদ্ধতিগত অচলাবস্থা
ট্রাম্পবাদের প্রভাবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই গভীর ধাক্কা লেগেছে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে মার্কিন প্রশাসন অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তা ও আচরণগত দোলাচলের পরিচয় দিয়েছে। প্রায়ই তারা প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক চুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। নেতৃত্বের এই অস্থির ধরন বৈশ্বিক শাসনের ভেতরের বড় দুর্বলতাগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং স্নায়যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার যে উদারপন্থি কাঠামো ছিল, তা দ্রুত ভেঙে পড়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে জাতিসংঘ, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি)। ট্রাম্পের নীতি নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতা, প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে আগে থেকে চলে আসা বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং ঔপনিবেশিক যুগের কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ আগেই পঙ্গু হয়েছিল–যেখানে সংস্কার আনার চেষ্টার চেয়ে অচলাবস্থা বেশি দেখা গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা বা সরে দাঁড়ানো পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর স্থায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। 
সমর্থকরা অবশ্য যুক্তি দেন যে ট্রাম্প প্রশাসন শুধু তাদের পছন্দের মিত্রদের সঙ্গে কাজ করে কিংবা নিজেদের অগ্রাধিকারের জায়গায় জাতিসংঘ মহাসচিবকে যুক্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট, উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনতে চেয়েছিল। সমালোচকরা এই পদক্ষেপগুলোকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার চেয়ে তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন।

বহুমেরু ও আঞ্চলিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমোড়লগিরির ভূমিকা থেকে পিছিয়ে আসার ফলে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিরাট পুনর্গঠন ঘটাচ্ছে। এই শাসনব্যবস্থার ঘাটতি মেটাতে এখন মাঝারি সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলো এবং আঞ্চলিক জোটগুলো সামনের সারিতে চলে আসছে।

তারা এমন কিছু আঞ্চলিক কাঠামো ও ইস্যুভিত্তিক জোট গঠন করতে শুরু করেছে, যা প্রথাগত পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প বা শক্তিশালী পরিপূরক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
বিশ্বরাজনীতির এই মোড় পরিবর্তন ট্রাম্পের রেখে যাওয়া অবদান নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, বহুমুখী আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে সরে আসা সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করেছে। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, দুর্বল হতে থাকা পশ্চিমা নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে এক বিপজ্জনক শূন্যতার পথ তৈরি করে দিয়েছে।

পরাশক্তির নতুন সংজ্ঞা
অনিশ্চিত কূটনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার চেয়ে জাতীয় সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে পরম জাতীয় সার্বভৌমত্ব জাহির করার মাধ্যমে ট্রাম্পবাদ মূলত এই আধুনিক যুগে একটি পরাশক্তি কীভাবে তার প্রভাব বা সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে।
সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এক অমলিন ছাপ রেখে যাবে। উদার বৈশ্বিকব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এটি চিরতরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে–যা বিশ্বকে ঠেলে দেবে বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিকতাবাদ এবং নতুন এক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সন্ধানে ভরা নতুন একটি যুগে।

ফিরাস দাবাঘ: জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
 

আরও পড়ুন

×