ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পিয়াইনের জলে এক দিনের পাঠশালা

পিয়াইনের জলে এক দিনের পাঠশালা
×

জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে বইছে নীলাভ জলরাশি ছবি:: মাহবুবুল আলম সাইদ

 শিশির কুমার নাথ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বইয়ের পাতায় বলা লেখা যেদিন চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়, সেদিন শেখার মানেটাই বদলে যায়। মৌলভীবাজার পিটিআইয়ের প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষাসফরের দিনটি ছিল তেমনই। গন্তব্য সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জনপদ জাফলং।

সকালের নরম আলোয় পিটিআই প্রাঙ্গণ থেকে চারটি বাস ছাড়ল। যাত্রী প্রায় ১৩০ জন। সঙ্গে ছিলেন ইন্সট্রাক্টর আমেনা আক্তার, এখলাসুর রহমান ও আশরাফুল ইসলাম। সাউন্ডবক্স বাজতেই বাসের ভেতরটা রীতিমতো উৎসব। বেসুরো গলার গান, তাল-বেতাল নাচ। ক্লাস রুমের নিয়মকানুন সেদিন জানালার বাইরে।
পথে ডিম-খিচুড়ি দিয়ে নাশতা সারা হলো। বাড়তি পাওনা আমেনা ম্যাডামের বাগানের পেয়ারা। জানালার ওপাশে ঢেউ খেলানো চা-বাগান, বাঁশঝাড়ে ঘেরা উঠান, ধানের কচি সবুজ পাতা। পথ কেবল গন্তব্যে পৌঁছায় না, ভেতরের অচেনা একটা জগতেও নিয়ে যায়।

ঘণ্টা তিনেক পর জাফলং। সূর্য তখন মাথার ওপর, কাঠফাটা রোদ। তারই মধ্যে পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে বইছে নীলাভ জলরাশি। পাহাড়, পাথর আর পিয়াইন–এই তিনে মিলে জাফলং যেন প্রকৃতির লেখা দীর্ঘ এক কবিতা। দূরের পাহাড় মেঘের চাদরে মুখ লুকালে মনে হয়, পৃথিবী খানিকটা নির্জন হতে চেয়েছে।
সেই নির্জনতা অবশ্য সীমান্তবাজারে এসে ভেঙে যায়। অলিগলিতে ঝুপড়ি দোকান– পাহাড়ি পাথরের স্মারক, খাসিয়া হস্তশিল্প, মুখরোচক খাবার। দোকানির হাঁকডাক আর পর্যটকের কোলাহলে টের পাওয়া যায়, সৌন্দর্যের গায়ে গায়েই চলছে টিকে থাকার হিসাব।

ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সবাই ছড়িয়ে পড়ল। আমরা কুড়িজন নৌকা ভাড়া করলাম, জনপ্রতি ১০০ টাকা। গন্তব্য মায়াবী ঝরনা–জিরো পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে, খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে। বৃষ্টি হয়নি বলে জলের ধারা ক্ষীণ, তবু ভিড় কম নয়। ওপারে খাসিয়া গ্রাম, পাহাড়ের কোলে সারি সারি সুপারিবন আর পানের বরজ।
জাফলং সৌন্দর্য বিলায়, সঙ্গে নিজের ইতিহাসটুকুও শোনায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই জনপদ ছিল খাসিয়া-জৈন্তা রাজার অধীন নির্জন বনভূমি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাজ্যটির অবসান ঘটে। এরপর দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা নৌপথে আসতে শুরু করেন পাথরের খোঁজে। পাথর ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বসতি, পরে পর্যটনকেন্দ্র। মেঘালয়ের ডাউকি পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীটি এখান দিয়েই বাংলাদেশে ঢুকেছে।

তীব্র গরমে পাহাড়ি নদীর হিমশীতল জল ছিল দিনের সেরা স্বস্তি। ক্লান্তি ভুলে সহকর্মীদের সঙ্গে জলকেলি। এরপর জৈন্তা হিল রিসোর্টে দুপুরের খাওয়া, গল্প আর হাসিঠাট্টা। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে ‘লাস্ট হাউস অব বাংলাদেশ’। ওই শেষ বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, মানচিত্রের সীমানা যেখানে ফুরিয়েছে, প্রকৃতি সেখান থেকে আরও গভীর। ওপারের মেঘ এপারে বৃষ্টি হয়ে ঝরছিল। ঝরনাকে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত যে ‘যৌবনভরা তাপসী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সে তুলনাটা তখন খুব সহজ মনে হয়।

খাওয়ার পর র‍্যাফেল ড্র। কেউ পুরস্কার পেয়ে আত্মহারা, কেউ বলছেন, ‘ইশ্‌, একটুর জন্য হলো না!’ পুরস্কার যারই হোক, আনন্দটা ছিল সবার।
তবে দিনটি নিছক আনন্দভ্রমণ ছিল না। ইন্সট্রাক্টর আমেনা আক্তার বলেন, ‘দক্ষ শিক্ষক হতে হলে সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রকৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাগে। শিক্ষা সফর তাই বিনোদন নয়; পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ আর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে জ্ঞানকে বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কার্যকর পদ্ধতি। পরিকল্পনা ঠিক থাকলে এটি পুরোদস্তুর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।’
জীবন্ত ভূগোলের এই পাঠে অস্বস্তির অধ্যায়ও আছে। যে পাথর জাফলংকে চিনিয়েছে, সেই পাথরই এখন জনপদটির বড় ক্ষত। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাফলংকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। তারপরও যন্ত্র দিয়ে পাথর তোলা পুরোপুরি থামেনি। নদীর তলদেশ খুঁড়ে, তীর কেটে পাথর তোলার ফলে পিয়াইনের নাব্য কমেছে, টিলা আর সমতল মিলেমিশে একাকার হয়েছে। ইঞ্জিননৌকার ধোঁয়া আর যেখানে-সেখানে ফেলা প্লাস্টিক যোগ করেছে বাড়তি চাপ।
আবার এ কথাও সত্য, হাজারো শ্রমজীবী মানুষের রুটিরুজি এই পাথরকে ঘিরে। তাই প্রশ্নটা পাথর বনাম প্রকৃতির নয়; প্রশ্নটা নিয়মের–কে তুলছে, কতটা তুলছে, কার লাভে তুলছে। পর্যটকের দায়িত্বটুকুও ছোট নয়। ফেলে আসা প্লাস্টিকের বোতলটিও এই হিসাবের অংশ।
জাফলং থেকে ফেরা যায়, জাফলংকে ফেলে আসা যায় না। কিছু দৃশ্য চোখে লেগে থাকে, কিছু মুহূর্ত মনে। এখানে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ, আর তার ছায়ায় মানুষের শ্রম লিখে চলেছে জীবনের নিরন্তর উপাখ্যান। সৌন্দর্য আর সংগ্রাম এখানে প্রতিদিন পাশাপাশি হাঁটে। 
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক
 

আরও পড়ুন

×