ব্রাইন পুল
মহাসাগরের অতলে আরেক হ্রদ
এইচ বি রিতা
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আপনি কি কখনও কল্পনা করেছেন, প্রশান্ত বা আটলান্টিক মহাসাগরের হাজার হাজার ফুট গভীরে দুর্ভেদ্য অন্ধকারের বুক চিরে হেঁটে যাচ্ছেন, আর হঠাৎ করেই আপনার সামনে এসে পড়ল শান্ত জলের এক বিস্তীর্ণ হ্রদ? সেই হ্রদের নিজস্ব তীরভূমি আছে, ছোট ছোট ঢেউ আছে, এমনকি ওপরের সমুদ্রের জলের সঙ্গে এর কোনো মিলও নেই! সমুদ্রবিজ্ঞানের ভাষায় গভীর সমুদ্রের এই ভৌগোলিক বিস্ময়ের নাম ‘ব্রাইন পুল’। এটি এমন এক অভিকর্ষজ বিস্ময়, যা আমাদের পরিচিত পৃথিবীর ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। মেক্সিকো উপসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের তলদেশে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বড় ব্রাইন পুলের সন্ধান পাওয়া গেছে।
সাধারণ সমুদ্রজলের তুলনায় এই হ্রদের জল তিন থেকে আটগুণ লবণাক্ত। উচ্চ ঘনত্বের কারণে এই অতি লবণাক্ত জল (ব্রাইন) আশপাশের সাধারণ সমুদ্রজলের সঙ্গে মিশে যায় না। ব্রাইন পুলও সমুদ্রের তলদেশে একটি সুনির্দিষ্ট ও পৃথক জলাধার তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল এবং মানববাহী সাবমার্সিবল ব্যবহার করে এই রহস্যময় পরিবেশের নমুনা ও তথ্য সংগ্রহ করছেন। এতে হ্রদের সীমানা বা ‘হ্যালোক্রাইন’ স্তর স্পষ্ট ধরা পড়ে। সাবমেরিন যখন এই পুলে অবতরণের চেষ্টা করে, তখন এর উচ্চ ঘনত্বের কারণে অনেক সময় তারা ভেতরে প্রবেশ না করে রাবারের মতো বাউন্স করে ওপরের দিকে উঠে আসে!
মেক্সিকো উপসাগরের তলদেশে থাকা এমনই এক ব্রাইন পুলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জ্যাকুজি অব ডেসপায়ার’ বা ‘মৃত্যুর জ্যাকুজি’। এই হ্রদগুলোতে অক্সিজেনের মাত্রা থাকে শূন্যের কোঠায়। সেখানে রাজত্ব করে হাইড্রোজেন সালফাইড এবং মিথেনের মতো বিষাক্ত গ্যাস। অসতর্কতাবশত কোনো সামুদ্রিক কাঁকড়া, ইল মাছ বা অন্য কোনো প্রাণী খাবারের সন্ধানে এই হ্রদের সীমানায় ঢুকে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই তারা বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে শকে চলে যায়। উচ্চ লবণাক্ততার কারণে ‘অসমোসিস’ বা অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় তাদের দেহের কোষ থেকে সমস্ত পানি দ্রুত বেরিয়ে যায় এবং প্রাণীটি মারা পড়ে। এই অতিরিক্ত লবণ মৃতদেহগুলোকে পচতে দেয় না, বরং আচারের মতো সংরক্ষণ করে। ব্রাইন পুলের তলদেশে ও তীরে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহের স্তূপ দেখা যায়– যেন গভীর সমুদ্রের এক নিঃশব্দ গোরস্তান।
বিজ্ঞানীদের মতে, জুরাসিক যুগে (প্রায় ২০ কোটি বছর আগে) পৃথিবীর অনেক অগভীর সমুদ্র শুকিয়ে গিয়েছিল। ফলে সেখানে লবণের বিশাল ও পুরু স্তর জমা হয়। পরে টেকটোনিক প্লেটের স্থানান্তরের ফলে এই লবণের স্তরগুলো মহাদেশীয় ভূখণ্ডের নিচে চাপা পড়ে যায়। এরপর যখন আবার সমুদ্রের পানির আগমন ঘটে, তখন সমুদ্রের তলদেশের ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে প্রাচীন সেই লবণের স্তরকে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত করতে শুরু করে। এই খনিজ মিশ্রিত অতি লবণাক্ত ভারী জল ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এসে সমুদ্রের তলদেশের নিচু খাদগুলোতে জমা হয়ে আজকের এই ব্রাইন পুলগুলোর জন্ম দিয়েছে।
মৃত্যু যেখানে অনিবার্য, জীবন সেখানেও নিজের পথ খুঁজে নেয়। এই চরম প্রতিকূল ও বিষাক্ত পরিবেশেও বিকশিত হয়েছে বিশেষ ধরনের অণুজীব; যাদের বলা হয় ‘এক্সট্রিমোফাইল’। উদ্ভিদ যেখানে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে, সেখানে এই অণুজীবগুলো ‘কেমোসিন্থেসিস’ (রাসায়নিক সংশ্লেষণ) প্রক্রিয়ার বিষাক্ত মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইডকে ভেঙে নিজেদের খাবার তৈরি করে। এই অণুজীবগুলোকে কেন্দ্র করে ব্রাইন পুলের কিনারায় গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র। বিশাল আকৃতির পলিকিট কৃমি (টিউব ওয়ার্ম), বিশেষ প্রজাতির ঝিনুক এবং কিছু ছোট ক্রাস্টেশিয়ান প্রাণী এই বিষাক্ত হ্রদের তীরে দিব্যি সংসার পেতেছে।
- বিষয় :
- ব্রাইন পুল
- সাগরে ডুবন্ত হ্রদ
- এইচ বি রিতা