যেভাবে বন্ধ হয়েছিল সবচেয়ে পুরোনো পারমাণবিক পরীক্ষাক্ষেত্র
কাজাখস্তানে ১৯৮৯ সালে পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী বিক্ষোভ; ইনসেটে কবি ওলজাস সুলেইমেনভ
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কাজাখস্তানের বৃহত্তম শহর আলমাআতায় ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিজের কবিতা পড়তে বসেছেন বায়ান্ন বছরের এক কবি। ক্যামেরা চালু, চিত্রনাট্য তৈরি। কিন্তু কাগজ সরিয়ে রেখে তিনি বলতে শুরু করলেন অন্য কথা– সেমিপালাতিনস্কের ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাগার থেকে কয়দিন আগে ফেটে বেরোনো তেজস্ক্রিয় গ্যাসের কথা, যে খবর রাষ্ট্র জানায়নি কাউকে। সোভিয়েত টেলিভিশনের ইতিহাসে সেটি সম্ভবত সবচেয়ে ব্যয়বহুল কবিতাপাঠ।
কবির নাম ওলজাস সুলেইমেনভ। দুদিন পর, ২৮ ফেব্রুয়ারি, আলমাআতার লেখক সংঘের ভবনের সামনে জড়ো হলো হাজার হাজার মানুষ। জন্ম নিল ‘নেভাদা-সেমিপালাতিনস্ক’– পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম গণআন্দোলন।
কী ছিল সেই স্তেপভূমির নিচে? ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট থেকে চার দশক ধরে আঠারো হাজার বর্গকিলোমিটারের এই এলাকায় সোভিয়েত সেনাবাহিনী ঘটিয়েছে সাড়ে চারশর বেশি পারমাণবিক বিস্ফোরণ– ভূমির ওপরে, ভূমিতে, ভূ-গর্ভে। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত প্রায় সবই ছিল উন্মুক্ত পরীক্ষা; তেজস্ক্রিয় মেঘ ভেসে গেছে আশপাশের গ্রামের ওপর দিয়ে। বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়নি, সরানো হয়নি। জাতিসংঘের হিসাবে, এই তেজস্ক্রিয়তার শিকার প্রায় পনেরো লাখ মানুষ। ক্যান্সার, জন্মগত ত্রুটি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে যাওয়া অসুস্থতা। কুয়ার পানি পান করে বড় হওয়া শিশুরা জানত না, সেই পানিও অস্ত্র পরীক্ষার অংশ। সমস্ত তথ্য ছিল সামরিক গোপনীয়তার আওতায়; ফলে চার দশক ধরে ক্ষতির কোনো হিসাব কেউ রাখেনি, ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও ওঠেনি।
সুলেইমেনভের পক্ষে চুপ থাকা কঠিন ছিল। ১৯৩৬ সালের ১৮ মে আলমাআতায় জন্ম সুলেইমেনভের। তাঁর বাবা ছিলেন কাজাখ অশ্বারোহী বাহিনীর কর্মকর্তা, স্তালিনের শাসনামলে শুদ্ধি অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন মারা যান, ছেলের বয়স তখন এক বছর। সুলেইমেনভের পড়াশোনা ভূতত্ত্বে, পরে মস্কোর গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউটে। রুশ কবি লিওনিদ মার্তিনভ তাঁকে নিয়ে বলেছিলেন–স্বভাবে ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষায় ভূতত্ত্ববিদ, আর ঈশ্বরের কৃপায় কবি।
আন্দোলনের নামটিও ছিল এক রাজনৈতিক কবিতা। কাজাখ স্তেপের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা মরুভূমি; যেখানে মার্কিন পরীক্ষার তেজস্ক্রিয় ধুলো বইছিল স্থানীয় আদিবাসীদের গ্রামের ওপর দিয়ে। কথিত শীতল যুদ্ধের দুই পাশের ভুক্তভোগীরা পরস্পরকে চিনল শত্রু হিসেবে নয়, স্বজন হিসেবে। ১৯৮৯ সালের ৬ আগস্ট– হিরোশিমা দিবসে–কারাউল গ্রামের কাছে জড়ো হলো প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ, আর পরীক্ষাক্ষেত্রের দিকে ছুড়ে মারল পাথর। কাজাখ প্রথায় অমঙ্গলের দিকে পাথর ছোড়া হয়। সেই বছর পরিকল্পিত আঠারোটি পরীক্ষার এগারোটি বাতিল করতে বাধ্য হয় মস্কো।
আন্দোলনটি কোনো একক নেতার ছিল না। এতে যুক্ত হয়েছিলেন চিকিৎসক, ভূপদার্থবিদ, শ্রমিক, শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সবচেয়ে বেশি– ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের নারীরা, যারা সন্তানের অসুস্থতার হিসাব দিয়েই তৈরি করেছিলেন প্রথম অনানুষ্ঠানিক তথ্যভান্ডার। কবি দিয়েছিলেন কেবল ভাষা আর মঞ্চটুকু।
১৯৯১ সালের ২৯ আগস্ট প্রেসিডেন্টের ডিক্রিতে চিরতরে বন্ধ হয় সেমিপালাতিনস্ক। তারিখটি আকস্মিক নয়–ঠিক বিয়াল্লিশ বছর আগে এই দিনেই এখানে পরীক্ষা চালানো হয় প্রথম সোভিয়েত পারমাণবিক বোমা। যে দিনটি শুরু হয়েছিল বিস্ফোরণে, সেটিই হলো চির নীরবতার দিন। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৯ আগস্টকে ঘোষণা করে ‘পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’। আন্দোলনের নথি ও চলচ্চিত্র সংরক্ষিত হয়েছে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ তালিকায়। নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সুলেইমেনভের নাম প্রস্তাবের কথা উঠলে তিনি নিজেই তাতে সম্মতি দেননি।
রাষ্ট্রীয় ভাষ্যকে প্রশ্ন করার অভ্যাস অবশ্যই তাঁর আরও পুরোনো। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘আজ ই ইয়া’ বইয়ে তিনি রুশ সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘ইগরের অভিযানের কাহিনি’ পুনর্পাঠ করে দেখান, তাঁর ভাষার স্তরে স্তরে মিশে আছে তুর্কি শব্দ ও তুর্কি জগৎ। স্লাভ ও তুর্কি সভ্যতার সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ভাষ্য এতে টলে গিয়েছিল; বইটি নিষিদ্ধ হয়, লেখক পড়েন প্রবল রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে। আজ সেটিকে দেখা হয় সোভিয়েত জ্ঞানকাণ্ডের বিউপনিবেশায়নের প্রথম দিককার ভাষ্য হিসেবে। বিস্ফোরণ হোক বা ইতিহাস–তিনি বারবার জানতে চেয়েছেন, কী চাপা দেওয়া হচ্ছে।
২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সুলেইমেনভ ছিলেন ইউনেস্কোতে কাজাখস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি। তাঁর কবিতা ও গদ্য অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, তুর্কিসহ বহু ভাষায়। গত মে মাসে নব্বই বছরে পা দিয়েছেন তিনি। আলমাআতায় তাঁকে ঘিরে হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, প্রকাশিত হচ্ছে বিবিধ সংকলন। তিনি সেই শহরেই থাকেন। সুলেইমেনভের জীবন তাই কেবল কাজাখস্তানের ইতিহাস নয়। ভাষা যখন সমাজের সাহস খুঁজে পায়, তখন তা আর অলংকার থাকে না; তা হয় ইতিহাসের গতিপথ।
- বিষয় :
- শাহেরীন আরাফাত
- পারমাণবিক অস্ত্র