ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাউলরে শূন্য হইতে হয়

বাউলরে শূন্য হইতে হয়
×

বাউল আবদুল গফুরের একতারায় বাজে একটা শতাব্দীর শব্দ / ছবি:: লেখক

ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আশি বছরের বেশি সময় ধরে গাইছেন। অক্ষরজ্ঞান নেই, লেখা স্বরলিপি নেই, তবু তাঁর বাঁধা গান ময়মনসিংহের গ্রামে-গঞ্জে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ঈশ্বরগঞ্জের সাখুয়া গ্রামে বাউল আবদুল গফুরের মরচে ধরা টিনের ঘরে বসে শোনা গেল দুর্ভিক্ষ, বিচ্ছেদ আর সাধনার এক দীর্ঘ জীবনের গল্প...
--------------------------------------------------------

‘আমি দিবানিশি জ্বলতে আছি তুষেরই আগুনে রে– / আর কতদিন থাকব আমি পন্থপানে চাইয়া...’
শ্রাবণের মিঠে রোদে কাঁচামাটিয়ার পাড়টা তখন সবুজে ছাওয়া, আমনের চারা হাওয়ায় দুলছে। তার ভেতর দাঁড়িয়ে দরাজ গলায় গাইছেন আবদুল গফুর। কথা, সুর, কণ্ঠ–তিনটিই তাঁর। গানের ভেতরের সেই না-আসা বন্ধুর জন্য অপেক্ষাটুকু যেন তাঁর নিজেরই বাউল-জীবনের প্রতিচ্ছবি।

গাজীপুরা বাজারে চা-বিরতিতে বাড়ির পথ জানতে চাইতেই ছফর আলী একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘আমরার গফুর বাউল? সোজা যাইবাইন গা–তারুন্দিয়ার ভারতীবাজার, হেইনো খালি কইলেই হইব সাউক্কা যামু। গেলেই কেউ না কেউ বাউলের বাড়ি দেখাই দিব।’ কথাটা মিথ্যা নয়–মাটির পথের দুধারে তালগাছের সারি পেরিয়ে সাখুয়ায় ঢুকতেই কেউ একজন আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল।

উঠোনে চেয়ারে বসে তখন দুপুরের ভাত খাচ্ছেন তিনি। কাঁপা হাতে কাঁচামরিচ-পেঁয়াজে রাঁধা বাতাইয়া মাছের চচ্চড়ি মেখে নিজের হাতেই খাচ্ছিলেন। চোখাচোখি হতে মুখে ভাত থাকায় আঙুলের ইশারায় বসতে বললেন। খালি গা দেখে স্ত্রী রুকিয়া বেগম টেনে দিলেন কাঠে ঝোলানো সাদা পাঞ্জাবিটা।

শৈশবের কথা তুলতেই কণ্ঠ নামল, ‘আমার পিতা কছিম উদ্দিন আছিল দিনমজুর চাষা। পেটের অভাবে ইস্কুল-মাদ্রাসায় যাইতে পারছি না। একটু বুঝমান হওনের পর আমিও মাইনষের কামে লাগলাম। তখন জমিদারি আমল–দশ শতাংশ মাটিতে আধমণ আউশ ধান হইত। খুব অভাব গেছিল, বেগরে মানুষ মরছে। জাগর ভাত আছিল তাগো বাড়িতে বাসন রাইখা আইতাম– ভাতের মাড়ের লাইগ্যা।’

এই স্মৃতির ভেতর দুটি সময় মিশে আছে। যে মহাদুর্ভিক্ষকে ইতিহাস ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলে, তা ১৩৫০ বঙ্গাব্দের–ইংরেজি ১৯৪৩ সাল। আর দেশভাগের পর ১৯৪৭ থেকে পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পূর্ববঙ্গে যে খাদ্যসংকট, লবণসংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা– এই ক্ষতও তাঁর কিশোরবেলার গায়ে লেগে আছে। আর তাঁর কাছে দুটোর নামই অভাব।

সেই ক্লান্তির ভেতরই তাঁর জীবনে প্রথম বাউলা বাতাস লেগেছিল পাশের মাঝেরচর গ্রামের এক গানের আসরে। ‘গান হুইনাই মনডা উতলা হইয়া গেল বাজান। মনে মনে কইলাম–আল্লাহ গো, আমি যদি এমন শিল্পী হইতে পারতাম, মানুষের মনডারে শান্তি দিতে পারতাম।’ সেই রাতেই পণ। এরপর রামনগরের ইতাব উদ্দিন বয়াতির কাছে আশ্রয়, তাঁর হাত ধরেই ভোলানালগী গ্রামের ওস্তাদ উমেদ আলী ফকিরের দরবারে। সাত বছর খেদমত–শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ঘুরে দেহতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব, পালা, জারি, প্রেম-বিচ্ছেদ। ‘তার লগে থাইকাই আমি বাউল হইয়া বাইর হইলাম।’

জীবনের প্রথম বায়না মধুপুরের চরশ্রীরামপুরে, পঁচিশ টাকায়। একতারা হাতে সেদিন গেয়েছিলেন নেত্রকোনার বাউলকবি রশীদ উদ্দিনের গান–‘চলো যাই শিকারে, ঐ না মধুপুরের গড়ে’। আসরের সেই উচ্ছ্বাসের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। চান মিয়া, আবেদ আলী ফকির, মকবুল বয়াতি, আলাউদ্দিন– সমসাময়িক প্রায় সব বড় সাধকের সঙ্গেই আসর করেছেন। পালা, জারি, সারি নিয়ে গেছেন প্রত্যন্ত গঞ্জে, গান বেঁধেছেন কৃষক নিয়ে, পরিবার পরিকল্পনা নিয়েও।

প্রায় আশি বছর ধরে সংগীত সাধনা করছেন বাউল আবদুল গফুর	ছবি:: সংগৃহীত

লিখতে জানেন না বলে বহু গানের কথা-সুর হারিয়ে গেছে চিরতরে। তবু ‘কী রে মন কলের ঢেঁকি’, ‘আজব রঙের কল বসাইছে মানুষের দেহায়’, ‘জাতি-জ্যোতি ফুল মালতি তুলবে যদি আয় রে আয়’, ‘এই বিশ্বহাটে চৌদ্দ তলায় জুড়ছে পাগলের মেলা’–এই গানগুলো আজও নতুন প্রজন্ম গায়, বেশির ভাগই না জেনে যে গীতিকবি কে।

বর্তমান সময়ের বাউলগান নিয়ে তাঁর ক্ষোভ চাপা থাকে না। ‘অহন বাউল গানের নামে যা হইতাছে, এইটা রং-তামাশা। আমরা যখন গাইছি, মানুষ গলাপানিতে খাড়াইয়া, গাছের আগায়, টিনের চালে বইয়া গান শুনছে–একচুল লড়ে নাই। বাউল মানে উদাস, তার কিছুই নাই, সর্বহারা। নিজেরে হারায়ে ফেলা, আত্মারে সংযম করা, লোভ ত্যাগ করা, সৃষ্টিকর্তারে পাওয়া–সর্বোপরি মানুষরে ভালোবাসা, মানুষের সেবা করা। আমিও শূন্য অহন। বাউলরে শূন্য হইতেই হয়।’

স্মৃতির ভাঁজে একটি দিন আলাদা হয়ে থাকে। ১৯৭৯ সালে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনে গৌরীপুরে এসেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রেলস্টেশনের কাছের জনসভায় বাউল আবদুল গফুরের গান শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘গানটা আপনি চালিয়ে যান।’ বাউলের ভাষায়, ‘ডেনায় ধইরা এক ঝটকায় মঞ্চে তুললেন। বইসা বইসা আমার সব গান শুনছেন।’

২০২০ সালে ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি বাউল আবদুল গফুরকে সম্মাননা দিয়েছে। তবে তাঁর চাওয়া দুটি–কোনো গবেষক যেন গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন, আর মাথার ওপর একটা ঠিকঠাক ছাদ। ‘ঘরটা মেরামতের অবস্থায় নাই। বৃষ্টি আইলে বইসা থাকতে হয়।’

ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম বলেন, ‘বাউল গফুর ময়মনসিংহের অহংকার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে তাঁর গানগুলো পাণ্ডুলিপি আকারে সংরক্ষণ করা যেত। ইউনেস্কো ২০০৫ সালে বাউলগানকে মানবতার মৌখিক ও অবস্তুগত ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়, ২০০৮ সালে তা প্রতিনিধিত্বশীল তালিকাভুক্ত হয়। তিনি সেই ঐতিহ্যের শতবর্ষের জীবন্ত সাক্ষী। তাদের মূল্যায়ন না করলে আমাদের সাংস্কৃতিক সংকট আরও ঘোরতর হবে।’

সন্ধ্যা নামছে। বাউলবাড়ির আমগাছে নানা জাতের পাখি ফিরছে। পুকুর হয়ে এসেছিলাম একটা সমুদ্রের গল্প শুনতে; সমুদ্র তো অতল, সমুদ্র ছাড়া তাকে কেউ মাপতে পারে না। ফেরার পথে মনে হলো–দিনশেষে মানুষ ওই শূন্য হয়েই ফেরে, জীবনে কিংবা মরণে। শতবর্ষী এই বাউল বেঁচে থাকুন তাঁর পরম আনন্দে।

আরও পড়ুন

×