ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘প্রাকৃত সমাজ’-এর বর্ষপূর্তিতে শেকড়ে ফেরার ডাক

‘প্রাকৃত সমাজ’-এর বর্ষপূর্তিতে শেকড়ে ফেরার ডাক
×

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৪৬ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:২৯

আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনে মানুষ যখন প্রকৃতি থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, ঠিক তখনই প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় শেকড়ে ফেরার ডাক দিয়েছে ‘প্রাকৃত সমাজ’। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হারানো সহাবস্থান নতুন করে অনুসন্ধানের এক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে উদযাপিত হলো সংগঠনটির প্রথম বর্ষপূর্তি।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর পরিবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রাকৃত সমাজের আলাপ ও গান’।

আয়োজনের শুরুতেই এক অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলির মাধ্যমে স্মরণ করা হয় সদ্য প্রয়াত অকুতোভয় পরিবেশযোদ্ধা রণজিৎ বাওয়ালীকে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা প্রচারের তোয়াক্কা না করে, কেবল আত্মিক তাগিদে আজীবন বিশুদ্ধ প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় লড়াই করে যাওয়া এই প্রকৃত ‘প্রাকৃতজন’-এর প্রতিই পুরো আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয়।

দিনব্যাপী এই আয়োজনে তাত্ত্বিক আলোচনা, শেকড়ের গান এবং ‘প্রাকৃত’ সাময়িকীর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে এক ভিন্নধর্মী বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ তৈরি হয়। আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ‘প্রাকৃত সমাজের আলাপ’। এই পর্বে বর্তমান প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর বেশ কিছু মৌলিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে, ‘ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা বহাল রেখে সকল প্রাণের সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব?’—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে বক্তারা বলেন, প্রকৃতিকে নিছক ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সম্পদ ভাবার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে না এলে সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা অসম্ভব।

এর পাশাপাশি সকল প্রাণের জন্য মঙ্গলজনক চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মপ্রকৃতির সন্ধান এবং জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের চলমান সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে গভীর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

এই গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নগর পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, পরিবেশ গবেষক পাভেল পার্থ, অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ, ডা. সুমন কে বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, কৃষিবিদ মো. মাহমুদ হোসেন, ড. মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন এবং দেলোয়ার জাহান। বিভিন্ন পর্ব অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন মুসা কলিম মুকুল, আয়ুর্বেদাচার্য দেবজ্যোতি দত্ত ও মো. ইফতেখার আলী।

তত্ত্ব আর যুক্তির পাশাপাশি সন্ধ্যায় শুরু হয় ‘প্রাকৃত সমাজের গান’। এই পর্বে মাটি, মানুষ ও মহাপ্রাণের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের চিরন্তন কথাগুলো গানের সুরে তুলে ধরেন জনপ্রিয় শিল্পী অরূপ রাহী, মুসা কলিম মুকুল ও কুয়াশা মূর্খ। তাঁদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের এক আধ্যাত্মিক ও ভাবগম্ভীর প্রশান্তি এনে দেয়।

কেবল আলোচনা বা উদযাপনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি নয় ‘প্রাকৃত সমাজ’। প্রথম বর্ষপূর্তির এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে মাঠ পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। চারপাশের বন উজাড় আর নদী দখলের ডামাডোলের মাঝে তাদের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি বাঁচলেই কেবল মানুষের অস্তিত্ব টিকবে।

আরও পড়ুন

×