কারাম বৃক্ষের খোঁজে
কারাম বৃক্ষ / ছবি:: দুর্জয় মাহাতো
উজ্জ্বল কুমার মাহাতো
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাদ্রের শুক্লপক্ষের একাদশী এলেই বাংলাদেশের সমতলের আদিবাসী গ্রামগুলোয় এক চেনা গুঞ্জন জাগে। ঢোল আর মাদলের ধামাকায় মুখরিত হয় মাহাতো, ওঁরাও, সাঁওতাল কিংবা মুণ্ডা পল্লিগুলো। এটি তাদের প্রাণের পরব–‘কারাম’ বা ‘করম’। লোকালয়ের প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে কারাম ও ধারাম–দুই ভাইয়ের অভাবমুক্তি ও সৌভাগ্য অর্জনের হাজার বছরের পুরোনো গাঁথা। কিন্তু যে কারাম বৃক্ষের ডালকে প্রাঙ্গণে পুঁতে এই আবহমান ঐতিহ্য ও প্রকৃতিপূজার উৎসব উদযাপিত হয়, সেই কারাম গাছটিই আজ আমাদের চারপাশ থেকে নীরবে হারিয়ে যেতে বসেছে। একটি গাছের অস্তিত্বের সঙ্গে কীভাবে একটি জাতিসত্তার আবেগ, ভাষা, সংস্কৃতি ও টিকে থাকার লড়াই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে, কারাম বৃক্ষ তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
পত্রমোচী বৃক্ষটি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ‘হরিদ্রু’ বা ‘গিরিকদম’ নামে পরিচিত। বর্ষার শেষে এর শাখায় ফোটে ছোট গোল গোল মেটে-হলুদ ফুল। উচ্চতায় প্রায় ৩৫ মিটারেরও বেশি বিস্তৃত হতে পারা এ বৃক্ষটির বাকল ও পাতার রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। তবে চেনার ভুল আমাদের প্রায়ই হয়। রাস্তার দুপাশে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা গামার গাছকে অনেকে ভুল করে কারাম গাছ মনে করেন। অথচ গামার পাতা শক্ত ও খসখসে আর কারাম গাছের পাতা বিশাল, নরম ও মখমলের মতো মোলায়েম। দুর্ভাগ্যবশত, অপরিকল্পিত বন উজাড় এবং বাণিজ্যিক বৃক্ষরোপণের তাণ্ডবে ঐতিহ্যবাহী এই মহিরুহ আজ সমতলের প্রান্তর থেকে বিলুপ্তির পথে।
এই বিপন্ন বৃক্ষটির সঙ্গে আমার ব্যক্তিসম্পর্কের সূচনা ২০১৩ সালে। মাহাতো জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ‘কুড়মালি’ ও বাংলা ভাষায় রচিত আমার প্রথম দ্বি-ভাষী উপন্যাস ‘কারাম’ যখন অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায়, তখন পাবনার রূপম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মানিক মজুমদার প্রচ্ছদের জন্য একটি প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, বইয়ের প্রচ্ছদে যেন আসল কারাম গাছ বা তার কোনো ডালের ছবি ব্যবহার করা হয়। সেদিনই ছবি তোলার জন্য কারাম গাছের খোঁজে বেরিয়ে আমি প্রথম ধাক্কাটা খাই। নিজ গ্রাম সিরাগঞ্জের রায়গঞ্জের আটঘরিয়া ও তার আশপাশে হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও একখণ্ড কারাম পাতার দেখা পেলাম না। অবশেষে পার্শ্ববর্তী তারাশ উপজেলার তেঘরি গ্রামে গিয়ে বহু কষ্টে একটি গাছের সন্ধান মেলে। সেদিনই বুকের গহিনে অভিপ্রায় জেগে উঠেছিল–নিজের গ্রামে যে কোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে হারিয়ে যাওয়া এই কারাম বৃক্ষকে।
এরপর শুরু হয় আমার কারাম বৃক্ষ সংরক্ষণের নিরন্তর পথচলা। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বীজ সংগ্রহের আশায় ফের তারাশের তেঘরি গ্রামে গিয়ে হাজির হলাম। গাছের নিচে ঝরে পড়া বীজের খোঁজ মিলল না। কারাম গাছের বীজ অতি সূক্ষ্ম, ছোট ও সনপাপড়ির আঁশের মতো হালকা। বাতাস এলেই তা উড়ে যায় দূরে, কিংবা পাখিরা খেয়ে ফেলে। প্রকৃতির বুকে পাখির মাধ্যমেই বংশবিস্তার ঘটে এই বিরল বৃক্ষের। বীজ না পেয়ে ২০২২ সালে ভিন্ন পথ ধরলাম। গাছে এয়ার-লেয়ারিং বা গুটি কলম করার চেষ্টা করলাম। মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও আশানুরূপ ফল মিলল না। ব্যর্থ হয়ে ডাল কেটে পুঁতে রাখলাম ভেজা কাদামাটিতে। ভেবেছিলাম হয়তো শাখা-প্রশাখা গজাবে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের কাছে পরাজিত হয়ে সেবারও হতাশ হতে হলো।
অনুসন্ধানে দেখা গেল, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার আদিবাসী অধ্যুষিত ৩৯টি গ্রামে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় টিকে আছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি কারাম গাছ। কোনো ব্যক্তিমালিকানায় বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে এর একটিও নেই। স্থানীয় বন বিভাগ কিংবা স্থানীয় হর্টিকালচার সেন্টারেও মেলেনি এর কোনো চারা। বৃক্ষটির এই সংকটকালে ২০২৩ সালের শেষের দিকে সন্ধান পেলাম সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট গ্রামের এক নিভৃত বৃক্ষপ্রেমীর। সেখানে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার’প্রাপ্ত সংগ্রাহক মাহবুবুল ইসলাম পলাশের গড়ে তোলা বিরল ও বিপন্ন বৃক্ষের সংগ্রহশালা।
ভদ্রঘাটের সেই প্রাঙ্গণে গিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সেখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে ছিল দুটি কারাম গাছ–একটি বড়, অপরটি ছোট। মাহবুবুল ইসলাম পলাশ, যিনি ব্যক্তিউদ্যোগে ৩৪৫টিরও বেশি বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ লালন-পালন করছেন, তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলো কারাম বৃক্ষের বংশবিস্তার ও চারা উৎপাদনের কৌশল নিয়ে।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত শুভদিন। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট মাহবুবুল ইসলাম পলাশ প্রথম কুড়মালি ভাষা-সংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র ‘কুড়মালি পাঠশালা’র জন্য তিনটি বিরল কারাম চারা উপহার হিসেবে হস্তান্তর করেন। আগে অনেক বিশাল কারাম গাছ দেখলেও, সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রজাতির একটি ছোট্ট চারা স্পর্শ করার অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন–যেন এক নতুন জীবনের সতেজ স্পন্দন।
উপহার পাওয়া চারাগুলোর দুটি রোপণ করা হয়েছে রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম আটঘরিয়া গ্রামে অবস্থিত ‘কুড়মালি পাঠশালা’ প্রাঙ্গণে। অন্য চারাটি রোপণ করা হয়েছে তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের বিষমডাঙা গ্রামে; যার পরম মমতায় লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন সমাজকর্মী সুদেব মাহাতো।
আজ সেই চারাগাছগুলো ডালপালা মেলে বেশ বড় হয়ে উঠেছে। রোদে চিকচিক করছে তাদের নরম, তুলতুলে, আদুরে সবুজ পাতাগুলো– দেখলেই ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। আজ মনে হয়, এই চারাগুলো কেবল একখণ্ড কাঠের বা পাতার অস্তিত্ব নয়; সিরাজগঞ্জের আদিবাসী অধ্যুষিত সমতলের মাটিতে কারাম বৃক্ষের এ নতুন শিকড় গেড়ে বসা মানে একটি বিপন্ন পরব। একটি হারানো ভাষা এবং হাজার বছরের প্রাচুর্যময় সংস্কৃতির পুনর্জন্ম। প্রকৃতির এই সবুজ ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারলে, সমতলের আদিবাসী জাতিসত্তাও তাদের শিকড় আঁকড়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
লেখক: কুড়মালি ভাষার লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- গাছ
- উজ্জ্বল কুমার মাহাতো
- কারাম বৃক্ষ