ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঘোড়ার গাড়িতে জীবিকা

ঘোড়ার গাড়িতে জীবিকা
×

সাঁথিয়ার বিলাঞ্চলে যন্ত্র যেখানে পৌঁছায় না, সেখানে আজও ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। ছবিটি পাবনার সাঁথিয়া বাজার এলাকা থেকে তোলা

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আলো ফোটার আগেই মেঠোপথে ধুলো ওড়ে। একের পর এক ঘোড়ার গাড়ি ছুটছে। প্রতিটি গাড়িতে বোঝাই সদ্য কাটা পাটগাছ। গন্তব্য খাল, বিল কিংবা নদীর তীর। খুরের শব্দ আর চালকের হাঁকডাক মিলিয়ে পাবনার সাঁথিয়ায় এখন পুরোদস্তুর পাটের মৌসুম। এবার ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকের মুখের হাসিটা ছড়িয়ে পড়েছে ঘোড়ার গাড়ির চালকদের সংসারেও। বছরের আর কোনো সময়ে তাদের হাতে এত টাকা আসে না...

 জালাল উদ্দিন
সাঁথিয়া উপজেলায় এখন পুরোদমে পাটগাছ কাটা চলছে। যেসব জমির পাশে জাগ দেওয়ার পানি নেই, সেখান থেকে পাটগাছ কেটে গাড়িতে তুলে নদী বা বিলে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। প্রতি গাড়ি পাটগাছ বহনের ভাড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। একজন চালক দিনে ছয়-সাতবার এভাবে টানেন। দিন শেষে আয় দাঁড়ায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। ঘোড়ার খাবার আর অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে দেড় থেকে দুই হাজার।
তলট এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, পাটগাছ বোঝাই গাড়িগুলো গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে চলেছে বিলের দিকে। কোথাও গাছগুলো নামিয়ে নতুন বোঝা তোলার তোড়জোড়। রাস্তার দুই পাশে রোদে শুকাচ্ছে পাটের আঁশ। চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা এক ব্যস্ত মৌসুমের ছবি। এই ব্যস্ততার ভেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু মানুষের গোটা জীবন।
সাঁথিয়ার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের পুরানচর গ্রামের মাহাতাব শেখের বয়স ৬৪। ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছেন প্রায় সাতাশ বছর। তার আগে চালাতেন প্যাডেলের ভ্যান। গ্রামের বেশির ভাগ সড়ক তখন কাঁচা। যাত্রী আর কৃষিপণ্য টানতে গিয়ে কষ্টের শেষ ছিল না। বৃষ্টির দিনে কাদা-নর্দমায় সেই কষ্ট বাড়ত কয়েক গুণ। তখনই তিনি দেখতেন, কেউ কেউ ঘোড়ার গাড়িতে অনেক সহজে একই মাল টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৯৯ সালে বাবার কাছে ঘোড়ার গাড়ি কেনার আবদার ধরেন। বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া তিন হাজার ৫০০ টাকা ছিল হাতে। বাবা জমি লিজ দিয়ে আর গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জোগাড় করেন আরও পাঁচ হাজার। সব মিলিয়ে আট হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি।
শুরুতে দিনে আয় হতো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এতে কোনো মতে সংসার চলত। এখন তাঁর ঘোড়া চারটি, দাম প্রায় দুই লাখ টাকা। কয়েকটি গাড়ি একসঙ্গে চলে বলে মৌসুমে দিনে তিন-চার হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। এ বছর পেঁয়াজের মৌসুমে আয় প্রায় ৫০ হাজার, পাটের মৌসুমে ৬০ হাজার। ধানের মৌসুমের মজুরি নিয়েছেন ধানেই–প্রায় ৮০ মণ। মৌসুম ফুরালে আয় নেমে আসে, তখন চলে অন্য মালপত্র টানা। ঘোড়ার খাবারেই দিনে চলে যায় ৩০০ টাকার মতো।
সাত সদস্যের সংসার–স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়ে। এই গাড়ি চালিয়ে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ২০১০ সালে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ করে তুলেছেন দুটি বসতঘর। কিনেছেন কিছু জমি, একটি মোটরসাইকেল।
মাহাতাব শেখ বলেন, ‘ঘোড়ার গাড়ি চালানো আমার পেশা, সংসার চালানোর একমাত্র পথ। যত দিন বাঁচি, এটাই করে যাব। যা করেছি সব এই গাড়ির আয় দিয়ে। কোথাও এক টাকা ঋণ নেই আমার।’
একই গ্রামের নাতু শেখের বয়স ৫০। তিনিও ২৫ বছর এ পেশায়। এক সময় অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করতেন। গাড়ি কেনার পর থেকে সংসারের খরচ টানতে আর হিমশিম খেতে হয় না। এ বছর পেঁয়াজ টেনে আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা, পাটে ৫০ হাজার, ধানের মৌসুমে পেয়েছেন প্রায় ৬০ মণ ধান। ছেলে সরোয়ার শেখও (৩০) এখন এই পেশায়, তাঁর গাড়ি দুটি। বাবা-ছেলে মিলে মৌসুমে দিনে চার-পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঘোড়ার পেছনে খরচ দিনে ৫০০ টাকার মতো। ‘ঘোড়ার গাড়ি এখন আমাদের একমাত্র ভরসা’–বলেন নাতু শেখ।
উপজেলার তলট, করমজা, সোনাতলা, গাগড়াখালিসহ বিভিন্ন গ্রামে এখন ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা দুই শতাধিক। চালকদের ভাষ্য, বছর দশেক আগেও এই সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাধিক। ট্রাক, ট্রলি, নছিমন আর ভটভটির দাপটে কমতে কমতে তা অর্ধেকের নিচে নেমেছে।
তবু কৃষকের কাছে এই বাহনের চাহিদা ফুরায়নি। কারণটা সহজ। সাঁথিয়ার বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে বর্ষায় কাদাপথে ট্রাক-ট্রলি ঢুকতে পারে না। সরু বাঁধ, আইল আর নিচু জমি থেকে ফসল তুলতে যন্ত্রের গাড়ির সীমাবদ্ধতা অনেক। খরচ কম, ওঠানামা দ্রুত, জমির একেবারে কিনারা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়–এই তিন কারণে ঘোড়ার গাড়ি টিকে আছে। ভারী গাড়ির মতো আইলও নষ্ট হয় না।
তলট গ্রামের দুলাল হোসেন এই পেশায় আছেন ১২ বছর। তিনি বলেন, ‘সারা বছর গাড়ি চালাই। তবে পাট আর ধান কাটার মৌসুমে আয় সবচেয়ে বেশি। এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চালিয়ে খরচ বাদে দেড় হাজার টাকার বেশি থাকে। কৃষকও সময় মতো পাট জাগ দিতে পারছেন, আমরাও ভালো আয় করছি।’
সোনাতলার আলতাব হোসেনের কথা আরও সোজা, ‘যন্ত্রের গাড়ি সব জায়গায় যেতে পারে না। অনেক জমিতে এখনও আমাদের এই গাড়িই ভরসা।’
তলটের পাটচাষি শফিউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের জমির পাশে জাগ দেওয়ার পানি নাই। গাড়িতে করে নদীতে নিয়ে যেতে পারছি বলে সময় মতো জাগ দেওয়া হচ্ছে। ঘোড়ার গাড়িওয়ালারাও ভালো ভাড়া পাচ্ছে।’
দামের হিসাবও এবার চালকদের পক্ষে। এ অঞ্চলের হাটগুলোতে চলতি মৌসুমে দেশি পাট মণপ্রতি তিন হাজার ৬০০ থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকা এবং তোষা তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে অনেকটাই বেশি। দাম ভালো মানে কৃষক দ্রুত পাট তুলতে চান, জাগ দিতে চান সময় মতো। তাতে বাড়ে গাড়ির ডাক। বাজারের এই সুবাতাস ঘুরেফিরে গিয়ে লাগে ঘোড়ার গাড়ির চাকায়।
কিন্তু এই পেশায় নতুন করে ঢোকা আর সহজ নয়। চালকেরা জানান, একটি গাড়ি বানাতে লাগে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ভালো মানের ঘোড়ার দাম ৭০ হাজার থেকে এক লাখ। সব মিলিয়ে এক লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ ছাড়া চাকা গড়ায় না। তরুণেরা তাই এদিকে কম আসছেন। যারা আছেন, তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ৫০ পেরিয়েছে।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এবার উপজেলায় সাত হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, ফলনও ভালো। বিলাঞ্চলের অনেক এলাকায় পাট পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি এখনও কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক।’
মৌসুম ফুরালে এই ব্যস্ততা থিতিয়ে আসবে। গাড়িগুলো ফিরবে ইট, বালু কিংবা খড়ের বোঝায়। ততক্ষণ পর্যন্ত ভোরের মেঠোপথে খুরের শব্দ বলে দেবে, সোনালি আঁশ এখনও ঘরে উঠছে। 

আরও পড়ুন

×