অভিমত
কৃষিঋণের সামাজিক রিটার্ন বিবেচনায় নিতে হবে
মো. তৌফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) কি সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংক? উত্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকেবি ও রাকাবের মূল কাজ শুধু আমানত সংগ্রহ করে মুনাফাজনক খাতে ঋণ বিতরণ নয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অর্থায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে মূলধনের প্রবাহ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করা। ফলে তাদের ঋণঝুঁকি, পরিচালন উদ্দেশ্য এবং সামাজিক দায় সবই সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন।
এই ভিন্নতা উপেক্ষা করে একই ঋণ শ্রেণীকরণ নীতি, প্রভিশন সংরক্ষণ নীতি এবং আর্থিক সূচক দিয়ে বিকেবি ও রাকাবকে মূল্যায়ন করা হয় তাহলে তাদের প্রকৃত ভূমিকা আড়ালে থেকে যায়। আরও বড় আশঙ্কা হলো, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক চাপ তাদের সেই কৃষকগোষ্ঠী থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যাদের অর্থায়নের জন্যই এসব ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একজন কৃষকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা শুধু তার দক্ষতা বা সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। বন্যা, খরা, রোগবালাই, ফসলহানি, বাজারমূল্যের পতন কিংবা উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মতো বিষয় তার আয়কে সরাসরি প্রভাবিত করে। একই অঞ্চলে বন্যা হলে হাজারো কৃষকের ঋণ একই সময়ে অনিয়মিত হতে পারে। এটি কোনো একক ঋণগ্রহীতার ব্যর্থতা নয়; বরং কৃষি খাতের কাঠামোগত বা সমষ্টিগত ঝুঁকি। এখানেই কৃষিঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
একজন শিল্প উদ্যোক্তার ঋণখেলাপির পেছনে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা কিংবা ঋণশৃঙ্খলার ঘাটতি থাকতে পারে। একজন কৃষকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা অনেক সময়ই প্রকৃতি, জলবায়ু এবং বাজারঝুঁকির ফল। তাই দুই ধরনের ঋণকে একইভাবে শ্রেণীকরণ অর্থনৈতিকভাবে সবসময় যৌক্তিক নয়।
শুধু খেলাপি ঋণের হার দিয়ে সফলতা মাপা যায়?
বিকেবি বা রাকাবের একটি কৃষিঋণ যদি একজন কৃষককে মহাজনি ঋণ থেকে মুক্ত করে, তার উৎপাদন বাড়ায়, কয়েকজন কৃষিশ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখে এবং বাজারে মূল্যচাপ কমায়, তাহলে সেই ঋণের মূল্য কি শুধু সুদ আয় বা খেলাপি ঋণের হার দিয়ে মাপা উচিত? সম্ভবত নয়। এখানেই আসে কৃষিঋণের সামাজিক রিটার্ন ধারণা। অর্থাৎ একটি ঋণ ব্যাংকের বাইরে সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে কতটুকু মূল্য সৃষ্টি করেছে, সেটিই এর প্রকৃত মূল্যায়ন।
বাংলাদেশে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনজ খাত মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১১ শতাংশ অবদান রাখে এবং দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে কৃষিঋণের পরিমাণ পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের তুলনায় খুবই ছোট। তবু এই সীমিত অর্থায়নের ওপর দেশের খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল। অর্থাৎ কৃষি ঋণের আর্থিক রিটার্ন তুলনামূলক কম হলেও এর সামাজিক রিটার্ন অনেক বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সারাদেশে ফসল উৎপাদন, সেচ, কৃষিযন্ত্র, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি উদ্যোক্তা খাতে অর্থায়ন করে। এর সবচেয়ে বড় সামাজিক অবদান হলো এমন কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় আনা, যারা অন্যথায় উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতেন। রাকাব রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ফল ও সবজি উৎপাদনের সঙ্গে ব্যাংকটির ঋণ কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। তাই এই দুটি ব্যাংককে শুধু ‘কত লাভ করল’ বা ‘খেলাপি ঋণের হার কত’– এই দুটি সূচক দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাদের প্রকৃত অবদানের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে
বিশ্বের অনেক দেশ কৃষি অর্থায়নকে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকিং হিসেবে বিবেচনা করে না। বরং কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে ফার্ম ক্রেডিট সিস্টেম কৃষক, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করে। এটি একটি স্বতন্ত্র আইনগত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় এবং পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা তদারক করা হয়।
ভারতে ন্যাশনাল ব্যাংক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (ন্যাবার্ড) কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন অর্থায়নের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। পুনঃঅর্থায়ন, সুদ ভর্তুকি, ঋণ গ্যারান্টি এবং কৃষক ক্রেডিট কার্ডের মতো বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি অর্থায়নকে সহায়তা করা হয়। চীনে এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব চায়না খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে অর্থায়ন করে। জার্মানির ল্যান্ডভির্টশাফটলিশে রেন্টেনব্যাংক কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য স্বল্প সুদে পুনঃঅর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান করে।
কী ধরনের পরিবর্তন দরকার
প্রথমত, বিকেবি ও রাকাবের জন্য পৃথক কৃষিঋণ শ্রেণীকরণ কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এতে ফসলের মৌসুম, উৎপাদন চক্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বাজারঝুঁকিকে বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার কৃষিঋণের জন্য ডায়ানামিক (গতিশীল) প্রভিশনিং বা চক্রভিত্তিক প্রভিশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে সাময়িক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যাংকের মূলধনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না করে। তৃতীয়ত, কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে খেলাপি ঋণের হার, সম্পদের ওপর মুনাফা এবং প্রভিশন কভারেজের পাশাপাশি কৃষিঋণের সামাজিক রিটার্ন যুক্ত করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও ডেটা বিশ্লেষক
- বিষয় :
- অভিমত