ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন দ্বীপ ও চার চৌকি আদালতে সাবজেল করার পরিকল্পনা

তিন দ্বীপ ও চার চৌকি আদালতে সাবজেল করার পরিকল্পনা
×

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের একমাত্র সাগরবেষ্টিত উপজেলা সন্দ্বীপ। এই উপজেলার গুপ্তছড়া ঘাট থেকে ১৮ কিলোমিটার সাগর পাড়ি দিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ঘাটে আসতে হয়। তারপর ৩৭ কিলোমিটার সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় চট্টগ্রাম শহরে। সাগরের উভয় পারে প্রায় এক কিলোমিটার কাদামাটি ও পানি মাড়িয়ে উঠতে হয় স্পিড বোটে। স্পিড বোটে ৩০ মিনিট সময় লাগলেও সি-ট্রাক এবং ট্রলারে যাতায়াতে সময় লাগত এক ঘণ্টা। চট্টগ্রাম শহর থেকেও একইভাবে যেতে হয় সন্দ্বীপে। 

এভাবেই বছরের পর বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে একবার স্পিডবোট-নৌকায়, একবার বাস-সিএনজি, আবার তিন চাকার ভ্যানে করে আসামিদের শহরে অবস্থিত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারগারে আনা-নেওয়া করছে পুলিশ। সাগর পথে ঝুঁকির সঙ্গে আসা-যাওয়া করতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থও। দীর্ঘ সাড়ে চার যুগ পর এবার সেই ঝক্কি-ঝামেলা ও দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে সন্দ্বীপে একটি সাব-জেল (কারাগার) করার উদ্যোগ নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। 

শুধু সন্দ্বীপ নয়, নোয়াখালী সদর থেকে হাতিয়া উপজেলার দূরত্ব সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। হাতিয়াও পুরোপুরি সাগর বেষ্টিত উপজেলা। নোয়াখালী সদর থেকে প্রথমে সোনাপুর হয়ে সড়কপথে ৩৫ কিলোমিটার দূরের সুবর্ণচরের চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে নৌপথে নদী পার হয়ে হাতিয়ার তমরুদ্দি ঘাটে পৌঁছাতে হয়। এই নৌপথের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। লঞ্চ কিংবা সি-ট্রাকে করে যেতে হয় হাতিয়ায়। এভাবেই প্রতিনিয়ত আসামিদের হাতিয়া থেকে নোয়াখালী, নোয়াখালী থেকে হাতিয়া আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে। সেই দ্বীপেও সাব-জেল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে বন্দি দুর্ভোগ কমানো, ঝুঁকি হ্রাস ও সরকারের ব্যয় কমাতে কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপ এবং আরও চারটি চৌকি আদালত থাকা চট্টগ্রামের বাঁশখালী, পটিয়া, কক্সবাজারের চকরিয়া ও বান্দরবানের লামা উপজেলায় সাব-জেল করার পরিকল্পনা করছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারণ জেলা কারাগার থেকে এসব উপজেলার দূরত্ব ৫০ থেকে একশ কিলোমিটারের বেশি। তাই বন্দি ব্যবস্থাপনায় ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম বিভাগের দুর্গম উপজেলায় সুবিচার নিশ্চিত করতে চৌকি আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও দুর্গম অঞ্চলের আদালতগুলোর বন্দিদের জেলা শহরে শুধুমাত্র থাকার জন্য প্রতিনিয়ত আনা নেওয়া করতে হচ্ছে। এতে বন্দি ভোগান্তির পাশাপাশি অপচয় হচ্ছে কর্মঘণ্টা। ওই সব এলাকায় সাব-জেল হলে জেলা সদরের কারাগারে কমবে বন্দির সংখ্যাও। 

এ ছাড়া সাগর উত্তাল থাকলে জেলা সদরের কারাগার থেকে বন্দি আসামিদের সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও মহেশখালী আনা-নেওয়া করা সম্ভব হয় না। তাদের থানা হাজতেই রাখতে হয়। এতে প্রয়োজন হয় পুলিশের বাড়তি ডিউটি। বন্দি আসামিদের তিন বেলা খাবারের বরাদ্দ নেই পুলিশের কাছে। তাই সঠিকমতো খাবারও পান না বন্দিরা। মামলার বিচারিক কার্যক্রমও গতিহীন হয়ে পড়ছে। জেলা সদরের কারাগার থেকে বন্দিদের চৌকি আদালতে পৌঁছাতে নেই প্রিজন ভ্যানও। তাই বাধ্য হয়ে পাবলিক বাস, সিএনজি, স্পিডবোট, সি-ট্রাক এবং ট্রলারে আনা-নেওয়ার ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। সাব-জেল হলে এসব সংকট খুব সহজেই লাগব হয়ে যাবে। বন্দি ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। 

সন্দ্বীপ থানার ওসি সুজন হালদার বলেন, সন্দ্বীপে চৌকি আদালত রয়েছে। কারাগার নেই। থানা হাজতে আসামি রাখলেও তাদের তিন বেলা খাবারে সরকারি বরাদ্দ নেই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে কারাগারে পৌঁছানোর কথা থাকলেও অনেক সময় ৭২ ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে না পুলিশ। সঠিক মতো কারাগার থেকে চৌকি আদালতেও হাজির করা সম্ভব হয় না। এখানে সাব-জেল হলে সেটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। বন্দি আসামিরা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে, পুলিশও বাড়তি ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে। প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ জন আসামিকে নিয়ে পুলিশকে খুব সমস্যায় থাকতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রিজন ভ্যান না থাকায় পুলিশ নিজেদের টাকা খরচ করে আসামিকে কারাগারে পৌঁছে দিয়ে আসছে। এর জন্য বিলও পায় না পুলিশ, চাইতে গেলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর চক্রে ঘুরতে হবে।
কারা বিভাগ চট্টগ্রামের ডিআইজি (প্রিজন্স) ছগির মিয়া বলেন, কারাগার সংশোধনাগারের অংশ হিসেবে বহুবিধ কাজ করছি। তারই অংশ হিসেবে বন্দি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিনটি দ্বীপে ব্রিটিশ আমলে আদালত তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেখানে কারাগার নেই। সাগর ও সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে বন্দিদের বিভাগীয় ও জেলা সদরে শুধুমাত্র থাকার জন্য আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে। এখানে ঝুঁকি রয়েছে, সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। কিন্তু ছোট একটি উদ্যোগ নিয়ে সাব-জেল করে দিয়ে সার্বিক দুর্ভোগ হ্রাস পাবে। তাই সাব-জেলের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×