ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি

শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্যপণ্যের বেশির ভাগই উৎপাদন হয় গ্রামে। পরিবহন ব্যয় এবং বিপণন প্রক্রিয়ায় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কয়েক হাত বদল হয়ে শহরের ভোক্তার কাছে আসে এসব পণ্য। আবার গ্রামের মানুষের আয় কম এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতাও কম। ফলে গ্রামে মূল্যস্ফীতি শহরের তুলনায় কম থাকার কথা। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা। শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি। গত ছয় অর্থবছর ধরে এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর আগের বছরগুলোর প্রবণতা স্বাভাবিক, অর্থাৎ শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি কম ছিল। 

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর গ্রামে সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। শহরের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে গ্রামে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ হার শহরে ছিল ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থবছরটিতে গড় মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরটির তুলনায় সামান্য কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে। 
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকার এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা গ্রামাঞ্চলে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। মাসটিতে গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ছিল শহরের তুলনায় অনেক বেশি। শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। গ্রামে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ। মাসটিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি শহর ও গ্রাম এলাকায় কাছাকাছি ছিল। 

গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, বিবিএসের এই তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং অর্থনীতির প্রচলিত চিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রামে বরং মূল্যস্ফীতি কম থাকার কথা। কেননা, গ্রামে উৎপাদিত পণ্য শহরে আসতে পরিবহন ব্যয় রয়েছে। আবার মধ্যস্বত্বভোগী আছে। ফলে শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই। 

তিনি বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রামীণ মানুষের আয় সাধারণত শহরের তুলনায় কম। সে কারণে একই হারে বা বেশি মূল্যস্ফীতি তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় আরও বড় আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির বেশি হার গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্রকৃষক, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। কারণ তাদের আয় অনিশ্চিত, সঞ্চয় সীমিত। অথচ বাজার থেকে কেনা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এই প্রবণতার কারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। এর কারণ জেনে গ্রামের মানুষের আয় বাড়াতে গ্রামভিত্তিক অর্থবহ নীতি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো নয়, কৃষি উপকরণের দাম, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় বাজার তদারকি এবং গ্রামীণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

মূল্যস্ফীতির গ্রাম ও শহরের মধ্যে এই বিপরীত চিত্রের পেছনের কারণ কী জানতে চাইলে বিবিএসের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, কী কারণে গ্রামে বেশি, সে অনুসন্ধান তারা করেন না। বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরতে সাড়ে ৭০০ পণ্য এবং সেবার দর যাচাই করে মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন তৈরি করেন তারা। তবে এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতি ও পরিসংখ্যান তৈরিতে কোনো ধরনের দুর্বলতা নেই। 
তবে গ্রামের চেয়ে শহরে মূল্যস্ফীতি কম হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সড়ক অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগে গ্রামে উৎপাদিত পণ্য দ্রুত শহরে চলে আসতে পারছে। মোবাইল ফোনের যোগাযোগের মাধ্যমে শহরের কোন অঞ্চলে কোন পণ্যের দাম কত বেশি, সেই তথ্য মুহূর্তের মধ্যে জানা যাচ্ছে। এসব কারণে গ্রাম পর্যায়ে পণ্য আগের মতো আর সহজলভ্য নয়। সহজলভ্য না হওয়ায় সেখানে দাম বাড়ছে।

বিবিএসের পুরোনো প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর গ্রামে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা শহরে ছিল ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে শহরের মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গ্রামে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর গ্রামে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা শহরে ছিল ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। 
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছর গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ওই অর্থবছর শহরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর গ্রামের ১০ দশমিক ২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে শহরের মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরগুলোতে শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি কম ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছর গ্রামের মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৬৩, যা শহরে ছিল ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। 

গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম শহরের তুলনায় বেশি হারে বাড়ায় গ্রামীণ পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় সামলাতে হচ্ছে। পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবারের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে গিয়ে তাদের সঞ্চয় কমছে, কেউ কেউ ঋণগ্রস্তও হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শহরের তুলনায় গ্রামে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্য ব্যয় কমিয়ে অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছে। গ্রামীণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার না হলে এই চাপ দ্রুত কমবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপই পারে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।

বিবিএসের উপাত্তে পণ্য ও সেবায় মূল্যস্ফীতির গ্রাম ও শহরভিত্তিক আলাদা চিত্রের মতো মজুরির ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরভিত্তিক আলাদা চিত্র থাকে না। তবে খাতভিত্তিক চিত্র থেকে মোটামুটি গ্রাম ও শহরের মজুরির একটি চিত্র পাওয়া যায়। যেমন, গ্রামাঞ্চলে মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। শহরে এই পেশা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, শিল্প ও সেবার উৎপাদন প্রায় একতরফা শহরকেন্দ্রিক। এ দুই পেশা গ্রামে অনেক কম। এখান থেকে গ্রাম ও শহরের মজুরির তফাত আন্দাজ করা যায়। 
বিবিএসের গত অর্থবছরের মজুরি হার সূচক (ডব্লিউআরআই) প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছর কৃষিকাজে মজুরি বাড়ার হার আগের অর্থবছরের চেয়ে কমেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ হারে, যা আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে  ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। পশু পালনেও একই চিত্র। আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর এই খাতের মজুরি বাড়ার হার কমেছে। ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে মজুরি বাড়ার হার ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্রামের পেশা মাছ চাষের চিত্রেও কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।  মৎস্যজীবীদের মজুরি বাড়ার হার আগের অর্থবছরের ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। 

অন্যদিকে শহরকেন্দ্রিক পেশা হিসেবে শিল্পকারখানায় মজুরি বাড়ার হার বেড়েছে। আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে গত অর্থবছর শিল্প খাতের মুজরি বেড়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। শহরের পেশা হিসেবে সেবা খাতের মজুরি বাড়ার হার গ্রামীণ কৃষি খাতের মজুরি বাড়ার হারের চেয়ে বেশি ছিল। গত অর্থবছর সেবা খাতের মজুরি বাড়ার হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অবশ্য আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছর সেবা খাতের বাড়ার হার কিছুটা কমেছে। ওই অর্থবছর ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ ছিল সেবা খাতের মজুরি বাড়ার হার। 
গত অর্থবছর সাধারণ মজুরি বাড়ার হার ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। আগের অর্থবছরও একই হারে মজুরি বেড়েছিল। বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইং প্রতি মাসে দেশের সব জেলা থেকে নির্ধারিত ছকের মাধ্যমে ৬৩ ধরনের মজুরি-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ ও যাচাই করে মজুরি হারের সূচক নির্ধারণ করে থাকে। ২০২১-২২ ভিত্তিবছর ধরে এই হিসাব করা হয়। 
গ্রামের মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশির আরও একটি চিত্র পাওয়া যায় বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে। ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বিবিএসের প্রকাশিত সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, গ্রামের মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। সেখানে একটি পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা আয় করে। ব্যয় হয় গড়ে ২৬ হাজার ৮৪২ টাকা। গ্রামীণ খানা পর্যায়ে আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ১৩ হাজার ১২৫ টাকা ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। 

প্রসঙ্গত, প্রতি মাসে মোট ৭৪৯ ধরনের পণ্য ও সেবার বাজারদর সংগ্রহ করে থাকে বিবিএস। সব সিটি করপোরেশন ও ৫৬ জেলা শহরে এবং ৬৪ জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার থেকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দর সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রণয়ন করা হয়। এ সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কতটা বাড়ল তার শতকরা হারই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি। এটির ১২ মাসের চলন্ত গড় হিসাব হচ্ছে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি।
গত ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। ওই অর্থবছরে ৯ শতাংশের কিছু বেশি হয় গড় মূল্যস্ফীতি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয় ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নামে। যদিও তা সরকার ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা যায়নি। গত অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। 
 

আরও পড়ুন

×