সেরা ১০০ বন্দরের বিশ্ব র্যাঙ্কিং
চার কারণে ৬৮তম স্থানে আটকে রয়েছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে আসা অপেক্ষমাণ জাহাজের সারি মো. রাশেদ
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চার কারণে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৬৮তম স্থানে আটকে রয়েছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। ২০২৫ সালে গড়ে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার পরও ২০২৬ সালে লয়েডস লিস্টের ঘোষিত সর্বশেষ র্যাঙ্কিংয়ে এগোতে পারেনি বাংলাদেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরের এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভালো র্যাঙ্কিং ৫৮তম স্থান। সেটিও তারা অর্জন করেছিল ২০২১ সালে।
বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীর্ষস্থানীয় বন্দরগুলোতে নৌ-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়া, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধি সেই তুলনায় কম হওয়া, পণ্য খালাসে অপেক্ষমাণ সময় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা ও রাজনৈতিক কারণে বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে আগের বছরের তুলনায় বাড়লেও সার্বিকভাবে প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে প্রবৃদ্ধি। এ জন্য ৬ বছর আগে অর্জন করা ৫৮তম স্থান এখনও ‘সেরা অর্জন’ হয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘লয়েডসের তালিকা অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ তিন বন্দরের একটি চট্টগ্রাম। আমাদের আরও ওপরে ওঠার সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে এক জায়গায় স্থবির হয়ে আছি আমরা।’
লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট ২০২৫ সালের কনটেইনার পরিবহনের তথ্যের ভিত্তিতে ‘ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০২৬’ শীর্ষক তালিকাটি প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময় শীর্ষ ১০০ বন্দরের সম্মিলিত কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এ জন্য এবারও এগোতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর। এ নিয়ে টানা দুই বছর ৬৮তম স্থানে আছে এই বন্দর।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড মেম্বার জাফর আলম বলেন, ‘নৌ-বাণিজ্য বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। প্রতিযোগিতায় থাকা বন্দরগুলোতেও তাই প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। আমাদের তুলনায় তাদের প্রবৃদ্ধি বেশি বলে ৬৮তম স্থানে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। তবে বিদেশি বিনিয়োগে চলমান থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত অপারেশনে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধির দ্রুত বাড়বে। তখন তালিকায় আরও এগিয়ে যেতে পারবে লাল-সবুজের বন্দর।’ দক্ষতা বাড়িয়ে জাহাজের গড় অপেক্ষমাণ সময় আড়াই দিন থেকে কমিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আনা হলে একই সময়ে আরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডল করা যাবে।
গত এক দশকে লয়েডস লিস্টের ক্রমতালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালে এক লাফে ৩৭ ধাপ অতিক্রম করে চট্টগ্রাম বন্দর দখল করেছিল ৫৮তম স্থান। এরপরে এমন ঊর্ধ্ব লাফ দিতে পারেনি। বরং আগের থেকে অবনতি হয়েছে র্যাঙ্কিংয়ে। গত ছয় বছর কনটেইনার পরিবহন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ২০২১ সালের প্রবৃদ্ধি আর কখনোই অর্জন করতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর। সর্বশেষ দুই বছর ৬৮তম স্থানে আটকে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর আগে একবার ৬৪তম স্থানে ছিল এই বন্দর।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে শীর্ষ চারে আছে চট্টগ্রাম বন্দর। ভারতের দুটি বন্দর এই তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের আগে রয়েছে। ভারতের মুন্দ্রা বন্দর ২৫তম ও জওহরলাল নেহরু বন্দর ৩০তম অবস্থানে আছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের অবস্থান ২৯তম। পাকিস্তানের করাচি বন্দরের অবস্থান ৮৪তম। করাচির চেয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে থাকায় শীর্ষ চারে অবস্থান ধরে রেখেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি। এটিই তাদের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ অর্জন।
বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউস (প্রতিটি কনটেইনার ২০ ফুট লম্বা)। ২০২৪ সালে পরিবহন হয় ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক কনটেইনার। কনটেইনার পরিবহন সেই হিসাবে ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই সময় চট্টগ্রাম বন্দরের আগে থাকা ৬৭টি বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের গড় প্রবৃদ্ধি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি হওয়ায় এবারও ৬৮তম স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে।
কোন বন্দর বছরে কত কনটেইনার পরিবহন করেছে, সেই তুলনা করে লয়েডস লিস্টের এই ক্রমতালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকায় শীর্ষে আছে সাংহাই বন্দর। ২০২৫ সালে সাংহাই বন্দর দিয়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় যা প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুর বন্দর ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন করে। ২০২৪ সালের তুলনায় কনটেইনার পরিবহনে তাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
- বিষয় :
- সমুদ্রবন্দর