ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনের রোবট অলিম্পিক

চীনের রোবট অলিম্পিক
×

বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে ২২ থেকে ২৬ আগস্ট বসেছিল দ্বিতীয় বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস

 শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইনালের রাতে ১০০ মিটার শেষ হলো ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে–উসাইন বোল্টের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের মানব-বিশ্বরেকর্ডের অনেকটা আগে। কিন্তু দৌড় শেষে থামার কায়দাটা যন্ত্রটির শেখা হয়নি। ফিনিশিং লাইনের ওপারে পাতা মোটা গদিতে সে গিয়ে আছড়ে পড়ল, শরীরে ধরে গেল আগুন।
বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে ২২ থেকে ২৬ আগস্ট বসেছিল দ্বিতীয় বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। যাকে ‘রোবট অলিম্পিক’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ৬৬৬টি দলের দুই হাজার ৫৬টি মানবাকৃতির রোবট, ৫১টি ইভেন্ট, পাঁচ দিনে এক হাজার ৩০১টি লড়াই। দৌড়, বক্সিং, ফুটবল, ভারোত্তোলন, ব্রেকড্যান্স, এমনকি চিয়ারলিডিং।
দুনিয়া দেখল, আর হাসল। বাধা টপকানোর দৌড়ে রোবটগুলো জাল গলে, সিঁড়ি বেয়ে, পাথর ডিঙিয়ে যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, এতে মন্টি পাইথনের পুরোনো স্কেচের কথা মনে পড়ে যায় কারও কারও। ঝলমলে পমপম হাতে চিয়ারলিডার রোবট হাত-পা ছুড়ছে খিঁচুনির ভঙ্গিতে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ ৪০০ মিটারে হোঁচট খাওয়া এক রোবটের ছবিতে ক্যাপশন দিলেন–রাত দুটোয় চার বোতল মদ খেয়ে ফেরার দৃশ্য। কেউ আবার ভারোত্তোলনের লড়াই দেখে অবাক হয়ে লিখলেন, এত আবেগ লাগবে ভাবেননি। যন্ত্রের প্রাণপণ চেষ্টায় মানুষ নিজের ছায়া দেখতে পায়।
কিন্তু হাসির নিচে সংখ্যাগুলো ঠান্ডা। গত বছরের প্রথম আসরে ১০০ মিটারে সেরা সময় ছিল ২১ দশমিক ৫০ সেকেন্ড। এক বছরে তা নেমে এসেছে সাড়ে আট সেকেন্ডের ঘরে। ৪০০ মিটারের রেকর্ড এক মিনিট ২৮ সেকেন্ড থেকে নেমেছে ৩৮ দশমিক ১৫ সেকেন্ডে, ১৫০০ মিটার সাড়ে ছয় মিনিট থেকে দুই মিনিট ২১ সেকেন্ডে। রোবটবিদ্যার শিক্ষকেরা বলছেন, এই অগ্রগতি স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো। তরল শীতলীকরণ ব্যবহার করে চীনা প্রকৌশলীরা মোটরের টর্ক বাড়িয়েছেন, ফলে হাত-পায়ের ধাক্কা এখন অনেক বেশি ক্ষিপ্র। শরীর এগোচ্ছে দ্রুত। মাথা পিছিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার একই কথা বলছেন– এগুলো বিশেষজ্ঞ যন্ত্র, সব্যসাচী নয়। যে ভালো দৌড়ায়, সে ভালো বক্সিং করে না। কারণ যে এআই মডেল তাদের সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়, সেটি এখনও বাস্তব দুনিয়ার জটিলতা সামলাতে পারে না। শিল্পটি অপেক্ষা করছে নিজেদের ‘চ্যাটজিপিটি মুহূর্তের’– যেদিন অচেনা একটা বাড়িতে গিয়ে মুখের কথায় ৮০ শতাংশ কাজ সেরে ফেলতে পারবে যন্ত্র। চীনের অন্যতম বড় নির্মাতা ইউনিট্রির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং শিংশিং বলেছেন, সে মুহূর্ত আসতে এক দশকও লেগে যেতে পারে। এখনও গণহারে মাঠে নামানোর মতো সক্ষমতা এদের হয়নি; সবচেয়ে বড় বাধা মডেলের সীমাবদ্ধতা।
অথচ টাকার স্রোত অপেক্ষা করতে রাজি নয়। গেমস শুরুর তিন দিন আগে সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্ত হয় ইউনিট্রি; প্রথম দিনেই শেয়ারের দর বাড়ে ৪৬০ শতাংশ, খুচরা বিনিয়োগকারীদের আবেদন জমা পড়েছিল চাহিদার আট হাজার গুণ। মরগ্যান স্ট্যানলির হিসাবে এ বছর চীনে ৫০ হাজার হিউম্যানয়েড সরবরাহ হবে, আর বাজারটি ২০৩০ সালের মধ্যে দুই বিলিয়ন থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১৫ বিলিয়ন ডলারে। পাশাপাশি সতর্কবাণীও আছে। এইচএসবিসির বিশ্লেষকেরা লিখেছেন, মডেলের সক্ষমতায় বড় উন্নতি না হলে চালানের এই জোয়ার এক-দুই বছরের বেশি টিকবে না।
গেমস তাই নিছক খেলা নয়, এক রকম শক্তি প্রদর্শনও। গত ২৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে বিদেশে তৈরি নতুন হিউম্যানয়েড ও চতুষ্পদ রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করেছে; যার ধাক্কাটা লাগে মূলত চীনের গায়ে। সামনে শি জিনপিং-ট্রাম্প বৈঠক, আলোচনার টেবিলে প্রযুক্তির আধিপত্য। চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় হিউম্যানয়েডের ‘ব্যবহারিক প্রয়োগ’ এবং শ্রমিক-সংকট ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ‘এমবডিড এআই’ নিয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার আছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ মানে যুদ্ধও হতে পারে। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা লিখেছেন, রোবটকে দৌড়াতে বা ফুটবল খেলতে দেখা এক জিনিস; এক দিন সীমান্তে বন্দুক হাতে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে দেখা সম্পূর্ণ আরেক জিনিস। বেইজিংয়ে যেদিন খেলা চলছিল, কিয়েভে সেদিন কুচকাওয়াজ হচ্ছিল শুধু রোবট-অস্ত্র নিয়ে।
সবচেয়ে জরুরি ইভেন্টগুলো অবশ্য ক্যামেরা পায়নি। টেবিল থেকে ছোট জিনিস তুলতে গিয়ে হাঁকপাঁক, বোতল থেকে পানি ঢালতে গিয়ে ছলকে ফেলা–এসব দেখাতে গিয়ে সম্প্রচার দ্রুত ফিরে গেছে মার্শাল আর্টের লাথিতে। অথচ ভবিষ্যৎ ওখানেই। ইঙ্গিতটা আছে পদক তালিকাতেও: সবচেয়ে বেশি ৪৬টি পদক নিয়ে শীর্ষে থেকেছে অ্যাজিবট, যারা সোনা জিতেছে সূক্ষ্ম হাতের কাজ আর বাস্তব দৃশ্যভিত্তিক ইভেন্টে। আয়োজকেরা বলছেন, ২০২৭ সালের পরের আসরে এ ধরনের ইভেন্টের সংখ্যা আরও বাড়বে। একজন পরামর্শক কথাটা সবচেয়ে সহজ করে বলেছেন–লিংকডইনে ভাইরাল হওয়ার মতো একটা কসরত দেখানো কঠিন নয়, কঠিন হলো কারখানায় সত্যিকারের কাজে লাগে এমন কিছু করা। 

আরও পড়ুন

×