ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে ‘না’

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে ‘না’
×
×

বিধান চন্দ্র পাল

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা কি চাইলেই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে ‘না’ বলতে পারি? প্রশ্নটি তোলা যতটা সহজ, বাস্তবতা ততটাই কঠিন। প্লাস্টিক এখন আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অসংখ্য কাজে আমরা সচেতন বা অচেতনভাবে এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। বাজারের ব্যাগ, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, কাপ-প্লেট, চামচ, মোড়ক- সবখানেই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছে। তাই এর ব্যবহার কমিয়ে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবন-যাপনের দিকে আমাদের এখনই এগিয়ে যেতে হবে।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এখন এতটাই সহজলভ্য এবং সস্তা; ছোট দোকান থেকে শুরু করে বিশাল বিপণিবিতান কিংবা বড় আয়োজন- সবখানেই এর ব্যবহার যেন স্বাভাবিক বিষয়। ব্যবহার শেষে প্লাস্টিক কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবস্থাপনা হচ্ছে বা কতটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে– এসব প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের বিবেচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর ৪০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের পর দ্রুত বর্জ্যে পরিণত হয়। অর্থাৎ আমরা এমন একটি উপকরণকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করছি, যার একটি বড় অংশের ব্যবহারকাল খুবই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর পরিবেশগত প্রভাব মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী।

অথচ একসময় আমাদের জীবন-যাপন এমন ছিল না। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বাজারে যাওয়ার সময় কাপড়, পাট বা অন্যান্য টেকসই উপকরণের ব্যাগ ব্যবহার করতেন। অনেক জিনিসই ছিল বারবার ব্যবহারযোগ্য। আজ আমরা তাৎক্ষণিক সুবিধার নামে এমন এক জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে জঞ্জাল হিসেবে থেকে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। 
প্লাস্টিক এখন শুধু শহরের ডাস্টবিন বা রাস্তার পাশে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নদী, খাল, জলাশয়, কৃষিজমি এবং সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় সামুদ্রিক ও স্থলজ প্রাণীর দেহে প্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকও এখন পরিবেশের বিভিন্ন অংশে শনাক্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

তবে আশার কথাও আছে। দেশে তরুণদের অংশগ্রহণে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গড়ে উঠছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির আওতায় টাইড টার্নার্স প্লাস্টিক চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন উদ্যোগ ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত তরুণদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্লাস্টিক দূষণ কমাতে কাজ করছে। কেউ শিক্ষার্থীদের ধাতুর নির্মিত পানির বোতল ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন। কেউ পরিচ্ছন্নতা ও প্লগিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কেউ প্লাস্টিককে অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে না মিশিয়ে আলাদা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ করছেন। আবার কেউ স্থানীয় পর্যায়ে বিকল্প পণ্য ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন। এসব উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্লাস্টিকের ভয়াবহ দূষণ রোধে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগই কি যথেষ্ট?
সমস্যার ব্যাপকতা বিবেচনায় আমাদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করতে বিকল্পকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে হবে। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে নতুন সম্ভাবনা, যাকে খুঁজে বের করে কাজে লাগাতে হবে। 

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি মানেই শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি নতুন উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে সুযোগ তৈরি করতে পারে। পাট, কাপড়, বাঁশ, বেত, তালপাতা, কচুরিপানা, কৃষিজ অবশিষ্টাংশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানীয় ও প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন গবেষণা, উদ্ভাবন, নকশা উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ এবং ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন। 

বিধান চন্দ্র পাল: প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রভা অরোরা 
[email protected] 

আরও পড়ুন

×