অন্যদৃষ্টি
প্রশ্ন ফাঁস এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা
সানোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত বেশির ভাগ তরুণের প্রধান লক্ষ্য সরকারি চাকরি পাওয়া। সে জন্য তারা বছরের পর বছর প্রস্তুতি ও একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। কেউ টিউশনি করে প্রস্তুতির খরচ জোগান; কেউ পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আবেদন ফি ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর যখন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে কিংবা পরীক্ষা স্থগিত হয়, তখন তাদের স্বপ্নের পাশাপাশি মূল্যবান সময়, অর্থ ও শ্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোটা পদ্ধতি, নিয়োগে অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এক পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। পরে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তরুণদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার হবে; সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে; মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তরুণদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়। তাদের আশা ছিল, অতীতের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচিত সরকার নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। কিন্তু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা। ২৪২টি পদের বিপরীতে তিন লাখেরও বেশি প্রার্থীর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। প্রথমে ১০ অক্টোবর ২০২৬ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ায় তা স্থগিত করা হয়। ঢাকায় প্রায় ১০০টি কেন্দ্রে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো কোনো কেন্দ্রে ওএমআর শিট বিতরণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে। দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রার্থী অনেকে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করেন। ফলে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত তাদের আর্থিক ক্ষতি, সময়ের অপচয় ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গত ১৬ অক্টোবর পুনর্নির্ধারিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে একটি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সরকারি কর্মচারী রয়েছেন।
এসআরবি-৩ এর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রটি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার সঙ্গে জড়িত। প্রশ্নপত্রের উৎস কোথায়, কীভাবে তা বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা– এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরীক্ষার্থীদের স্পষ্ট তথ্য জানানোও জরুরি।
এ ঘটনায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভূমিকা যদি তদন্তের আওতায় আসে, তাহলে একই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে সব দিক খতিয়ে দেখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাই কেবল একটি পরীক্ষার সমস্যা নয়। এটি নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সানোয়ার হোসেন: সাংবাদিক
ও লেখক
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি