প্রতিবেশী
আন্দোলনে মোদি সরকার যতটা চাপে
মঞ্জুরে খোদা
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে তরুণদের প্রতিবাদ এখন আর সামাজিক মাধ্যমের ব্যঙ্গাত্মক প্রচারে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ আন্দোলন কি নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, নাকি ধীরে ধীরে গতি কমে আসবে?
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের অধীনে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো– বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা আইনগতভাবে অযোগ্য এবং কতজন যোগ্য নাগরিক ভুলবশত বাদ পড়েছেন; যাদের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে, তারা কার্যকরভাবে তা পুনরুদ্ধার করতে পারছেন কিনা।
নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল ভোট গ্রহণের দিন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর নির্ভর করে না। ভোটার তালিকা তৈরির প্রতিটি ধাপেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়। কারণ একজন যোগ্য নাগরিকের ভোট দেওয়ার সুযোগ হারানো শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; তাঁর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও সৃষ্টি করে।
এই বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কমিশন অবশ্য অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে যখন জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন শুধু বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা বলে সেই সন্দেহ দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত।
এখানেই ‘ককরোচ’ আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য। এর শক্তি শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে নয়। বরং কে ভোট দিতে পারবেন; ভোটার তালিকা কীভাবে তৈরি হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা কে নিশ্চিত করবে– এসব মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসায়। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি ও বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে বহু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও নির্বাচনী স্বচ্ছতার প্রশ্ন তাদের একটি অভিন্ন অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে। তবে এই সাময়িক সমন্বয়কে এখনই স্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ঐক্য কতটা টেকসই এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে আন্দোলনের সম্পর্ক কতটা গভীর হয়, তার ওপর। বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয় তরুণদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিপরীতে ভোটার তালিকার ত্রুটি ও নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের প্রশ্ন অনেকের কাছে তুলনামূলক দূরবর্তী রাজনৈতিক ইস্যু মনে হতে পারে। আন্দোলনটি যদি এসব বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে না পারে, তাহলে তরুণদের একটি বড় অংশের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের অনুরূপ পদ্ধতি ও ভিত্তিতে অপসারণ করা যায়। ফলে রাজপথের চাপ সৃষ্টি হলেই তাঁকে অপসারণ করা সম্ভব নয়। আন্দোলনের সাফল্যকে শুধু পদত্যাগের সঙ্গে বেঁধে রাখলে সরকার ও কমিশনের পক্ষে আইনি সীমাবদ্ধতার যুক্তিতে দাবি প্রত্যাখ্যান করা সহজ হবে। বরং ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের নাম পুনঃসংযোজন, সংশোধন প্রক্রিয়ার তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন তদন্তের মতো সুনির্দিষ্ট দাবি আন্দোলনকে বাস্তব ফল অর্জনের সুযোগ দিতে পারে।
এ আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের তুলনাও সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনই ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা নয়; বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে তৈরি হওয়া সন্দেহের বিশ্বাসযোগ্য জবাব দেওয়া। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদেরও বুঝতে হবে, বড় সমাবেশ বা একজন কর্মকর্তার পদত্যাগই চূড়ান্ত বিজয় নয়। ভোটারদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনআস্থা বাড়ানোই হওয়া উচিত আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত ‘ককরোচ’ আন্দোলনের শক্তি নির্ধারিত হবে তার প্রতিবাদের তীব্রতা কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; বরং কতটা বিস্তৃত জনসমর্থন অর্জন করতে পারে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপর। আন্দোলনটি যদি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে তা মোদি সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মঞ্জুরে খোদা